banner

We love to create unique, successful templates for your websites

Countdown Timer Expired

Days
Hours
Minutes
Seconds
দুঃস্বপ্নের দিন

নিঘাত কারিম 

  দুঃস্বপ্নগুলো এখন টুসির পায়ে পায়ে চলে। ওরা এখন ওর নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই প্রতিটা রাতের দুঃস্বপ্নকে এখন আর দুঃস্বপ্ন মনে হয় না। মনে হয় ওরা তো আসবেই আমায় ছেড়ে যাবে না। ওরা বাস্তবের খুব কাছাকাছি-ই থাকে। বাস্তবই তো কারণ তারা আসে প্রতিদিন ঘুমের ঘোরে। চারিদিকে ফিসফাস বাবা নেই, কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। টুসির বয়স এগার। বাবা হারিয়ে যাওয়ার এই পর সে পুরাই চুপচাপ হয়ে গেল। এতো আদরের বাবা ওকেও ভুলে গেল! কী এমন আকর্ষণ যে বাবা চলে গেল আর ওদের জীবন এমন ঝড়ের মুখে পড়তে হলো। টুসির কারও সাথেই কথা বলতে ভালো লাগে না। শুধু ভাবে বাবা কোথায় গেল! টুসিকে রেখে তো কোথাও যাওয়ার কথা না। অন্যদের সাথে টুসিকে খুব বেশি কথা বলতে হতো না। তবে সে নিজের সাথেই নিজের কথা বলত। আর বাবা ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। প্রতি মুহূর্তের প্রতিটি কথা বাবাকে বলতেই হবে। পাখির মতো কিচমিচ চলে অনবরত। আর রয়েছে বই। ছোটবেলা থেকেই মন খারাপ হলে চোখ বন্ধ করে একটি পরিচিত বই স্পর্শ করে বইয়ের গন্ধ নিঃশ্বাসের সাথে বুকের গভীরে টেনে নিয়ে টুসীকে সুখী করার জন্যে যথেষ্ট। বাবা আর বই। কিন্তু এখন এতো পছন্দের বইও কোনো কাজ দিচ্ছে না। বাবার জন্য মন শুধু কেমন করছে। মায়ের কাছেই থাকছে, মায়ের বুকের গন্ধ কান্নার সাথে মিশে গিয়ে অস্থিরতা ভর করেছে পাথরের মতো। বাবাকে খুঁজে পেতে হবে কিন্তু কোথায়? আজ চারদিন। দিন-রাত অস্থিরতা আর দুঃস্বপ্ন। কালো চাদরে ঢাকা দিন-রাত্রি। মায়ের কান্না, আত্মীয় স্বজনের খোঁজাখুঁজি আর পুলিশের অনুসন্ধান। কোনো কিছুই কাজ করছে না। শেষ কোথায় দেখা গিয়েছিল তাকে। কেউ বলছে নদীর ধারে দেখেছিল। টুসির বাবা পুলিশের ওসি। পুলিশ হয়েও কখনো বাবা অসৎ পথে পা বাড়াননি। সৎ একজন পুলিশ অফিসার। টুসির বাবা সব সময় বলতেন আমি অসৎ হলে আমার ছেলেমেয়ের ক্ষতি হবে। বাবা মায়ের অসৎ আচরণ ছেলে মেয়ের উপর পড়ে আর কোনো বাবা-মাই এটা চায় না‌। ওপারেও আমার বাবা মা অশান্তি পাবে। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তিনি তো ভালোই আছেন। টুসির বড় খালা ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছেন ওদের ওখানে। টুসিরা দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন থানায় থাকে বাবার চাকরির জন্য। মফস্বল শহরগুলো তখন খুব সুন্দর ছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর টুসির ভালোই লাগে। ঢাকার কোলাহল থেকে এই শান্ত সুন্দর পরিবেশ ওর বেশি পছন্দ। ওরা বাবার কাছ থেকে দূরে থাকতে চায় না তাই সাথে থাকার জন্যই ঢাকায় থাকে না। থানার ওসির জন্য একতলা সুন্দর একটা বাসা। ঠিক গড়াই নদীর পাড়ে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশিতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছেই ওরা থাকে। টুসির বাবা খুবই বন্ধুবৎসল হাসিখুশি মানুষ। যখন যে জেলাতেই পোস্টিং হয় আত্মীয় বন্ধুদের আমন্ত্রণ করে বেড়াতে আসার জন্য। ঢাকার যানজট হৈ চৈ থেকে বাঁচার জন্য অনেক আত্মীয়-স্বজন ওদের এখানে বেড়াতে আসে ছুটি কাটাতে। সেদিন বড় খালারা আসাতে বেশ আনন্দ চলছে বাসায়। টুসির মা রান্নাবান্না আর আতিথেয়তা নিয়ে ব্যস্ত। বাচ্চারা আনন্দে ছুটাছুটি করছে। টুসি, ওর খালাতো বোন লিজা, ভাইয়াদের আরও আশেপাশের বন্ধু ভাইয়াদের সাথে গেল নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করতে। সেদিন ছিল শুক্রবার ছুটির দিন অফিস তো ছুটি তাহলে সবার প্রশ্ন কোথায় গেল সে? অনেক খোঁজের পর টুসির পাশের বাসার এক ছোট মেয়ের কাছে জানা গেল ওরা বাচ্চারা একসাথে নদীতে গোশল করতে গিয়েছিল সেখানে লিজা ডুবে যায় আর টুসির বাবা লিজাকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটিকে বাঁচায় তারপর আর সে কিছু জানে না। থানার পুলিশেরা তখন ওসি সাহেবকে নদীতে খোঁজা শুরু করে, থানার সমস্ত সিপাই নদীতে নেমে যায়। জাল ফেলে খুঁজতে চেষ্টা করে কিন্তু কোনো হদিস পাওয়া যায় না। অনেক খুঁজেও না পেয়ে সবাই হতাশ কিন্তু পুলিশী অনুসন্ধান চলতেই থাকে। সে সময় ছিল বর্ষাকাল নদীতে প্রচুর স্রোত। ফুলে ফেঁপে আছে গড়াই। পাঁচদিন পর থানা থেকে অনেক দূরে অন্য এক থানার কাছে এক সেপাই গোশল করতে গিয়ে একটা লাশ পেল। অন্যান্যদের ডেকে তাকে উদ্ধার করা হলো। তখন এই মানুষটিকে চেনার কোনো উপায় নেই। ফুলে বিকৃত হয়ে গিয়েছে চেহারা, মাছে চোখ খেয়ে ফেলেছে কিন্তু সেপাইটি তাকে ঠিকই চিনতে পারল কারণ এই ওসির আন্ডারে সে বেশ কিছুদিন কাজ করেছে। বড় ভালো লোক ছিলেন তাদের স্যার। টুসির বাবা লিজাকে ঠিকই বাঁচাতে পেরেছিলেন কিন্তু সাঁতার জেনেও নিজেকে বাঁচতে পারেনি তার দেহ প্রমত্ত গড়াই নদীর স্রোতের টানে অনেক দূরে ভেসে চলে গিয়েছিল। এখন টুসির দিনগুলো সব সময় কাটে দুঃস্বপ্নের ভেতরে। বাবার এমন বিকৃত দেহ যদিও তাকে দেখতে দেয়া হয়নি তবুও বাবা তার চোখের সামনেই থাকে। এমন অপমৃত্যু সে মানতে পারছে না। ছোট্ট মনে প্রশ্ন বাবা তো সাঁতার জানতো কিন্তু তারপরও হারিয়ে গেল কেন? ছোট্ট মেয়েটি জানে না নদীর উন্মত্ততার কথা। সারাটা জীবন তাকে তাড়া করে ফিরবে এই দুঃস্বপ্ন। এই একটি দিন জীবনকে পাল্টে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। টুসি এখন আর টুশ টুশ করে কারো সাথে কথা বলে না। বই নিয়ে ডুবে থাকে। নদীর ধারে সে আর কখনও যায়নি। পৃথিবীর সব নদী তার কাছে খারাপ কারণ নদী তার বাবাকে ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।