জাকিয়া খান
নামে মনে হতে পারে কিশোরদের বই। যুদ্ধে এক কিশোরের অবদান নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বই এটি। কিশোরসহ সকলেই পড়ে জানতে পারবেন অনেক অজানাকে।
ইসতিয়াক আহমেদ দুলাল ১৫ বছর ৬ মাস বয়সী ছিলেন ১৯৭১ সালের মার্চে। মাঝের পঞ্চাশ বছরে ভাবনার জগতে ঘটেছে বিশাল পরিবর্তন। চিন্তায় যোগ হয়েছে নতুন বিষয় আর মাত্রা। দেশ, সমাজ, বিশ্ব সম্পর্কে বোঝার জায়গায় এসেছে স্বচ্ছতা। সেখানে দাঁড়িয়ে কিশোরবেলার যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গেলে অতি আবেগ কিংবা বালকসুলভ ধারণার প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু তিনি নির্মোহ দৃষ্টিতে বলে গেছেন।
সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় ছিল তাদের ঘাঁটি। তাঁর বিবরণে পাকবাহিনী বা মিলিটারির সাথে লড়াইয়ের কথা না পেলেও পাই রাজাকারদের কি করে শায়েস্তা করা হতো বা ক্যাম্পে পরিচালিত নানা কর্মকাণ্ডের ছবি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে আসা মানুষদের কীভাবে ব্যবস্থা করা হতো বা পালিয়ে ইন্ডিয়া যেতে চাওয়া মানুষদের কোন উপায়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো- তার চিত্র পাই। একজন মানুষের হয়ে ওঠার গল্প পাই।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাস সুন্দরবন এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছে। পাকিস্তানিরা একবারের জন্যও তা নামাতে পারেনি। এটি একটি বিশেষ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। ঘাঁটি হিসাবে সুন্দরবন ছিল প্রায় অগম্য। সামগ্রিক যুদ্ধের ইতিহাসে সুন্দরবনকেন্দ্রিক যুদ্ধের বিবরণ খুব বেশি পাওয়া যায় না। সেই বিচারে কিশোর ইসতিয়াক আহমেদ দুলালের স্মৃতিচারণ গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরিও বটে। ৫০ বছর পর সহযোদ্ধাদের নাম, যুদ্ধের নানা খুঁটিনাটি বিষয় হয়তো স্মরণে আনতে পারেননি। তারপরও অমূল্য এ স্মৃতিচারণ।
প্রায় ৪০ বছর দেশের বাইরে থাকেন। অভিমান নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু মন আর মননে ধারণ করেন বাংলাদেশকে। বেশ কয়েকবারই বলেছেন, এত মনোযোগ দিয়ে কেউ কখনো এসব কথা শোনেনি। বলার মতো পরিবেশ পাননি। স্ক্রিনে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে জল চিকচিক করত চোখে। ক্ষরণ হতো আমারও। বইতে কষ্ট হতো। কিন্তু এই মানুষগুলো এভাবে শোনাবার জন্য আর কত দিনই বা থাকবেন আমাদের মাঝে। জ্বলজ্বলে স্মৃতিতে ধুলো জমবে। সরাতে পারব না। তাই শুনতেই হবে।
স্মৃতিচারণ মানে সময়কে জানা, পারিপার্শ্বিকতাকে বোঝা, দেশ ও দশের চালচিত্রের সন্ধান লাভ করা। মুক্তির এ ইতিহাস হয়তো আগামীর ভিত রচনার পাথেয় হবে।
ছয়মাস মুক্তিযুদ্ধজীবন কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে পাল্টে দেয়, জীবনবোধ বদলে যায়, পরিপক্ক করে তোলে। ফিরে এসে সমবয়সীদের সাথে মিশতে পারেন না আগের মতো। অস্ত্র নেড়ে আসা মানুষগুলো, স্বপ্নের রাজপুত্ররা সব পেছনে ফেলে পরিণত হয়েছিলেন সাধারণ মানুষে। যে দেশের জন্য জান বাজি রেখেছিলেন, দেশের মানুষের জন্য অস্ত্র তুলে নিয়ে শত্রু নিধনে পিছপা হননি, তাঁরাই অনেকের কাছে অনুকম্পা আর উপহাসের পাত্রে পরিণত হন। সহ্য করতে না পারা বড় অপরাধ নয়। দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ফেরা হয়নি আর স্বভূমে। অতিথির মতো এসে কিছু সময় কাটিয়ে আবার ফিরে যান নতুন ঠিকানায়। এমন অনেককে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। এ দায় কী চাইলেই আমরা অস্বীকার করতে পারব?
মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা তথ্য ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষদের কাছ থেকে মৌখিক বা লিখিত তথ্য ও দলিলপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক, আঞ্চলিক বা ঘটনাভিত্তিক ইতিহাস রচনা হয়তো সম্ভব। ইতিমধ্যে আমরা হারিয়েছি অনেককে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই হারাতে হবে। যাঁরা জীবিত আছেন, বয়সের কারণে তাঁদের স্মৃতিও অস্পষ্ট হতে পারে। তাই যতটা সম্ভব মুক্তিযোদ্ধাদের বয়ানে তাঁদের সংগ্রাম আর যুদ্ধজয়ের ইতিহাস লিখে রাখতে হবে। রিলে রেসে যেমন একজন আরেকজনের হাতে লাঠিটা ধরিয়ে দেন দৌড়কে এগিয়ে নিতে, এ কাজকে তেমনিভাবে নিতে পারলে হয়তো এখনো যাঁরা আমাদের মধ্যে আছেন, তাঁদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পারব। এটা যত না তাঁদের জন্য, তারচেয়ে বেশি আমাদের বেশি প্রয়োজন। বইটি সকলের পড়তে ভালো লাগবে আশা করি।