জাকিয়া শিমু
রফিক চৌকিদারের অন্তিম অবস্থা চলছে- গাঁওগেরামের ভাষায় যাকে বলে আয়েশ-ওঠা’র কাল। তবে তাজ্জব একটা বিষয় লক্ষ করা গেল! এমন একটি মর্মভেদী সংবাদে অকারণ-উৎসাহী গাঁয়ের লোকজনের মাঝে তেমন কোন আক্ষেপ কিংবা উৎসাহ দেখা গেল না- এ যেন বিয়ানবেলায় পূবদিকে সূর্য ওঠা’র মতো অতি তুচ্ছ-সাধারণ ঘটনা!
এবছর মাঘের শীত কড়াভাবে গ্রামগুলোর উপর জেঁকে বসেছে। এতবেলা করেও সূর্যের দেখা মেলে না। ভরদুপুরে একআধটু যাও দেখা যায়- একবেলা মৃদু উত্তাপ ছড়িয়ে টুপ করে ডুবে, বিজলিবাতি শূন্য এই গ্রামদেশে ঘোরসন্ধ্যা নামিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে যায়। তারপরও গ্রামীণ জীবনযাত্রা থেমে থাকে না এই যেমন, আজ; এমন ঠাণ্ডাজার উপেক্ষা করে বড়োঘাটের বটতলার চা-ঘরে গুটিকয় লোকের জমায়েত দেখা গেল। হাড় কাঁপানো শীতের এই বেলায় চায়ের কাপে তারা গাল-গপ্পের উত্তাপ খুঁজছে কিন্তু সেখানেও চকিদারের এমন খবরে বিচলিত হওয়া তো দূরের কথা- তাদের নিজস্ব আলাপ থেকে একবিন্দু নড়ানো গেল না। তারা এ-বিষয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে তাদের পুরনো আলোচনায় ডুবে গেল। ওদিকে বাচ্চা-বুড়োরা শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে এইবেলা করেও লেপ-কাঁথায় শরীর ডুবিয়ে কোনমতে চোখজোড়া বের করে পিটিপিটি তাকিয়ে আছে। অতি সামান্য বিষয়ে তাদের মধ্যে অস্থির অবস্থা দেখা গেলেও এ খবর তাদের চোখমুখ স্থির স্থানু হয়ে রইল, বিশেষ করে বুড়োদের কথা বলতেই হয়, তারা ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থেকে যেন সে সংবাদ হজম করল। মেয়েদের হেঁসেল ঘরে ধোঁয়া ওঠা আগুনে জলখাবার আয়োজনের তোড়জোড় চলছে - আচানক হলেও সত্যি- পান থেকে চুন খসার জো যেখানে নাই সেখানেও এমনতরো দুঃসংবাদ শীতকালের সূর্যালোকের মতো তেজহীন, উত্তাপহীন হয়ে পড়ে রইল।
তবে গাঁয়ের কিছু অতি উৎসাহী ছেলেপুলেকে ভাগাড়ের মতো দুর্গন্ধভরা মরা-নদীর পাড়ে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। তারা পিঁপড়েরদল কোন অভিযানে যাত্রার পূর্বে যেমন শলাপরামর্শ করতে খানিকক্ষণ দলবদ্ধ হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে সে রূপে তারাও হয়তো কোন বদ মতলবে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদের মাথায় সারাক্ষণ দুষ্টবুদ্ধি খেলে বেড়ায়,শীত-গ্রীষ্মের তীব্রতা দিয়ে এদের দমানো মুশকিল।
শীতকালে আকাশের মতো খোলা মাঠগুলো আধা কাঁচা-পাকা রবিশস্যে ভরে ওঠে। খানিকবাদে হয়তো দেখা যাবে কারো ক্ষেতের মটরকলুই নাড়ায় পুড়িয়ে উত্তাপের উছিলায় গৃহস্থের সর্বনাশ করছে। কিন্তু না, স্বাভাবিক আশংকা উড়িয়ে দিয়ে পিঁপড়ের দলের মতো ওদের দলটা ভেঙ্গে-চুড়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। নদীতীর ধরে দৌড়ে বড় মাঠটার পশ্চিমপাশ কেটে রফিক চকিদারের বাড়ি যাওয়ার সরু কাঁচা সড়কটা ধরে দূরে অস্পষ্ট পথে মিলিয়ে গেল। খোঁজ নিয়ে অবশ্য জানা গেল, ভিন্নকাহিনী। ছবদের আলী নাকি বদ্ধউন্মাদ হয়ে গায়ের কাপড়চোপড় ছেড়ে ন্যাংটা হয়ে দিকবিদিক ছুটোছুটি করছে। এবং বৈশাখ মাসের ঘূর্ণিবায়ুর মতো পাগলের পেছন পেছন এরাও উদ্দেশ্যহীনভাবে দৌড়ে বেরাচ্ছে !
রফিক চৌকিদারকে গাঁয়ের লোক সোজা বয়ানে চকিদার ডাকে। চকিদারের থেকে মানুষের মন উঠে গেছে- এর কারণ অবশ্য একটা নয়, হাতের কড়ে গুনেও যেন শেষ হবার নয়। শরীরের আকার-গঠন অনেকাংশে মানুষের চরিত্র প্রকাশ করে। চকিদার দেখতে-শুনতে ছোটখাটো নাদুসনুদুস বেঢপা সাইজের, গোলগাল মাটির হাঁড়ির মতো পেটটা শরীর থেকে অতিমাত্রায় সরে যেয়ে মাচায়-ঝুলা লাউয়ের মতো যেন হাওয়ার পড়ে দুলতে থাকে। হাঁটতে শুরু করলে পায়ের আগে পেটখানা দুলেঝুলে এগিয়ে চলে। মাথার মধ্যভাগটা শালগমের মতো চুলশূন্য হলেও পেছনদিকে পাটের আঁশের মতো ফ্যাসফ্যাসে কিছু রুগ্ন চুল ঘাড়ের কাছে যেয়ে বড়ো বেমানান হয়ে লেপটে থাকে। নাকটা চায়নামানুষের মতো অতিরিক্ত থাবড়ানে,তার দু’ধারের গহ্বরে মার্বেলের ন্যায় গোল এবং ঈষৎলাল চোখদুটোর দিকে তাকালে রাজ্যের শয়তানি টের পাওয়া যায়। তার মতো কুচুটে, ধরিবাজ লোক এ গাঁয়ে আর একজনের খোঁজ মেলা ভার ! কথার আগেপিছে কু-কথা না বলে যেন তার মন ভরে না। কথা বলতে শুরু করলে তার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো দায় হয়ে পড়ে, ভাঙ্গাচোরা পোকাখাওয়া দাঁতগুলোর ফাঁক দিয়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো স্রাবের-ছিটা চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এতকিছুর পরও সামনাসামনি অনেকে তার অযাচিত ক্ষমতা এবং অবৈধ-বিষয়সম্পদের দাপটকে ভয় পেয়ে তাকে সমীহ করার ভান করে।
যৌবনে চকিদারের কাছে বিয়েশাদি বিষয়টা অনেকটা নেশাভাংয়ের মতো ছিল। মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে সে হাওয়া হয়ে যেত। কিছুদিন পর দেখা যেত, নিজকন্যার বয়সী কচি লাউয়ের ডগার মতো উঠতি অভাবী ঘরের কোন মেয়েকে নতুন শাড়িতে প্যাঁচিয়ে বাড়ি নিয়ে ফিরেছে। তবে একমাত্র বড়ো বউ ছাড়া বাকিরা বছরখানেকের ওপর তার সংসারে স্থায়ী হয় নাই। প্রথম বউটা ঘাটের মড়ার মতো করে এখনো তার ভিটেরমাটি কামড়ে পরে আছে। একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো বাধ্য হয়ে রয়ে গেছে। লোকে অবশ্য বলে- বাপ-মা মরা বউটার নাকি এ কুলে কেউ নেই বিধায় এই নরকে পচেগলে রয়ে যেতে হয়েছে। সহজসরল নরম কাদামাটির মতো বউটা স্বামীর এতসব অপকর্ম মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছে তাও কতো বছর হয়ে এল !
ছেলেটার বয়স তখন চারপাঁচ হবে, সংসারটা ভালোমন্দে টেনেটুনে গাঁয়ের আর দশটা অভাবী সংসারের মতো চলছিল বৈকি। একরাতে চকিদার বাড়ি ফিরল না। সরকারি লোক, নানান কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। কোথায় কেউ অপঘাতে মরল, কেউ ঝগড়া ফ্যাসাদ বাঁধাল কিংবা সরকারি আইনের কর্তারা রাতবিরাতে আসামী ধরতে আসল- এসব কাজকর্মে গাঁয়ের চকিদারকে বড়ো বেশি প্রয়োজন হয়, কাজেই তার বাড়ি ফেরা নিয়ে পড়শিরা তো বটে, বউটাকেও তেমন উচাটন হতে দেখা গেল না। কিন্তু পরপর দু’দিন পার হলে সবার কপালে অবধারিত চিন্তার চিড়ল ভাঁজ লক্ষ্য করা গেল এবং তার খোঁজদরবার শুরু হল। কিন্তু সম্ভাব্য কোথাও তার হদিস পাওয়া গেল না !
প্রায় সপ্তাহ কেটে গেলে চকিদারকে ভীষণ আমুদে মেজাজে বাড়ি ফিরতে দেখা গেল, তার সাথে হাঁটুরবয়সী এক মেয়ে, কলাপাতা রঙের তাঁতের শাড়িতে আগাগোড়া মোড়ানো। কাগজের ঠোঙ্গার ভেতর সদাইপাতি যেমন কুঁকড়েমুচড়ে থাকে সেরূপে শাড়িতে অনভ্যস্ত অল্পবয়সী মেয়েটি মাড়দেওয়া চটচটে শাড়িতে দেহটা প্যাঁচিয়ে দলা পাকিয়ে চৌকিদারের পেছন পেছন মাথা যথাসম্ভব নিচুকরে বাড়ির পরে ওঠে আসে। মুহূর্তে পটকা-ফাটা আওয়াজে সেখবর ছড়িয়ে পরে গাঁয়ের সর্বত্র। এমন গরমখবর শোনে গ্রামসুদ্ধলোকের ঢল নামল চকিদারের বাড়ির পরে। চকিদার উঠোনের মাঝখানে জলচৌকি পেতে নয়াবউকে বসিয়ে গত সাতদিনের জমানো গল্প বলতে শুরু করলে উৎসাহীরা হাঁ হয়ে তার গল্প গিলতে লাগে।
তবে গাঁয়ের বৌ ঝিদের আগ্রহ নয়াবউয়ের চেয়ে বড় বউয়ের উপর যেন একটু বেশিই দেখা গেল। কারন অবশ্য একফুঁয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। এমন একটা অঘটন ঘটে গেল, অথচ বড়ো বউটার মধ্যে একফোঁটা ভাবাবেগও দেখা গেল না। চোখে জল নেই, ক্রোধের বারুদ নেই, শাপশাপান্ত নেই এমনকি মুখে দুঃখের সামান্য বিষণ্ণ ভাবসাবও নেই। তাকে খুব সাধারণ মেজাজে ঘরগৃহস্থালির কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। চকিদার গাঁয়ের বাজার থেকে মাটিরহাড়ি ভর্তি রসগোল্লা আর একজোড়া ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরেছেন। বড়োবউ হাসি হাসি মুখে সবার মাঝে রসগোল্লা বিলাতে ব্যস্ত। ইলিশ মাছ কেটে হলুদ লবণে মাছ যত্ন করে মেখে বাইরবাড়ির ছাইয়েরস্তূপ থেকে বিশাল সাইজের একটা মানকচু কেটে নিয়ে আসে। মানকচু দিয়ে ইলিশমাছ, চকিদারের পছন্দের খাবার। তিনি মাছ রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাকে খুবই স্বাভাবিক দেখাল, যেন কাজকাম শেষে স্বামী ঘরে ফিরেছে তার পছন্দের খাবার পাতে ঢালতে সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গাঁয়েরলোকেরা তার এমন স্বাভাবিক আচরণে বড় বিরক্ত হল। বিশেষকরে বৌ ঝিরা, এরা ঘরের কাজবাজ রেখে যে তামাশা দেখতে ছুটে এল আদতে তার কিছুই পূরণ হল না।
শেষমেশ অবশ্য ‘বড় বউটার স্বামী ধরে রাখার মুরদ নাই বলেই চকিদার কচি মেয়েতে আসক্ত হয়েছে’ এমন ধারণা এরা শুধু মনের মধ্যে বয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হল না, গাঁয়ে তা যথার্থ ভাবে রটিয়ে দিয়ে তবেই মনের সান্ত্বনা নিয়ে বাড়ি ফিরল। বড় বউ অবশ্য এদের আক্ষেপ বুঝলেন এবং নীরবে সয়ে গেলেন। তবে তাকে বেশ ঠাণ্ডা মাথায় একটা কাজ করতে দেখা গেল- নিজের এতদিনের সাজানো-ঘরটা স্বেচ্ছায় নতুন বউকে ছেড়ে দিয়ে চুলাপাড়ের পাশে অপাংক্তেয় পড়ে থাকা খড়ির ঘরটা ঝেড়েমুছে সেখানে গিয়ে ওঠলেন। চকিদারের সাথে একপাতে খেলেও সেদিন থেকে মনটাকে ভিন্নপাতে পাকাপোক্তভাবে বেঁধে ফেললেন ! তারপর থেকে তাকে আর চকিদারের সাথে মিলমহব্বতের দৃশ্যে দেখা গেল না। সংসারে থেকেও অধরা থেকে বাস করলেন বাকি জীবন!
এরপর গাঁয়ে নতুন বউর গা-গতরের রকমসকম নিয়ে বিশদ পর্যায়ে গালগপ্প শুরু হল, যেমন- বউটার গায়ে-গতরে মাংস নেই, আমসির মতো চিমসে দেখতে। মেয়ে মানুষের শরীর থাকবে- মহিষের মতো থলথলে, নেড়েচেড়ে আরাম পাওয়া যাবে। তাছাড়া বউটার হাঁটাচলা পুরুষমানুষের মতো, বুক উঁচিয়ে চলে, আদব লেহাজেও ঘাটতি আছে- এসব চিহ্ন বৈশিষ্ট্যহীন মেয়েমানুষের আদরকদর করতে নেই! আরও কতো কী ! হাওয়ায়- ওড়া এসব কথাবার্তা চকিদারের কানে সহজে পৌঁছে যায় এবং তারমধ্যে বিরূপভাব লক্ষ্য করা যায়। দেখা গেল বিয়ের বছর না ঘুরতে নয়া বউর উপর থেকে তার মন উঠে গেল ! এবং আদর কদর আসলেই বউটার কপালে বেশিদিন আর জুটল না।
প্রতিবারের মতো সেবারও গাঁয়ে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসল। বেশ বড়ো মেলাই বসত তখন। মেলা উপলক্ষ করে গানের দল আসল গাঁয়ে। গানের সাথে যেমন বাদ্যযন্ত্র না হলে চলে না সেরূপ কোমর-মাজা দুলেঢুলে অল্পবয়সী নাচনেওয়ালী না হলেও যেন গানের আসরের জৌলুশ ঠিকঠাক ধরা দেয় না। গানের দলের সাথে সেরকম কিছু নাচের মেয়েকেও দেখা গেল। মেলা শেষ হলো কিন্তু আশেপাশের বিভিন্নস্থানে পালা করে গান চলতে লাগল। চকিদার গানবাজনার সমঝদার লোক -তাকে গানের দলের সাথে খাদেমের ভূমিকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল। আকাশ ক্ষণে ক্ষণে রং বদল করে, বেশিক্ষণ একদৃশ্য ধরে রাখতে পারে না। চকিদারের মনটাও আকাশের মতো অস্থির- সারাক্ষণ ছটফট করে! অশান্তমন বাগে আনতেই কিনা কে জানে, এবার সে গায়েগতরে পরিপুষ্ট বুক-কোমরে মেদভর্তি এক নাচনেওয়ালীকে বিয়ে করে ঘরে ফিরে আসে।
দ্বিতীয় বউটার কপাল পুড়ে! বউটা এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার শুরুতে গলাফাটিয়ে চিৎকার আহাজারি করলেও দু’একদিন পর তাকে রেসের ষাঁড়ের মতো মূঢ় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মুখে রাও নেই, অসহায় ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকে। নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ বাড়িরকাছের পোড়োবাড়ির পুকুরপাড়ে, হিজলগাছের তলে চুপচাপ বসে থাকে। ধীরেধীরে তারমধ্যে নানান রূপ প্রকাশ পায়-এই পাগলের প্রলাপ বকে, কেদেকেটে চোখেরজলে বুক ভাসায় আবার পরক্ষণেই কাচের চুড়ির মতো ঝুনঝুন আওয়াজে হেসে কুটিকুটি হয়! পড়শিরা বলে- জীনে আছর করেছে। একদিন দেখা গেল- মাটির কলস গলায় বেঁধে পুকুরে মরে পরে আছে ! অবশ্য লোকমুখে ফিসফিস শোনা গেল ! চকিদার মেরে গলায় কলস বেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে দিয়েছে। থানা পুলিশ কিছুই হল না, হবার জোগার কোথায় ! নাম ঠিকানাহীন মেয়ে, মেয়ের আত্মীয়পরিজন কাউকে খোঁজখবরে দেখা গেল না। মেয়েমানুষ, তা থাকুক শক্ত নাম-ঠিকানা, তা-তে কি, হারিয়ে গেলে খোঁজ নিয়ে ঝামেলায় জড়াতে চায় ক’জন ! আর এর-তো কোনো পরিচয়ই নেই। অতিসহজে সে বিস্মৃত হয়ে গেল!
একদিন চকিদারকে ফাঁসির মড়া পোস্টমর্টেম করতে পুলিশের সাথে শহরে যেতে হল। রাতটা মড়া পাহারা দিয়ে, পরেরদিন বাড়ি ফিরে দেখল, তার দু’চালা টিনের ঘরখানা খাঁ-খাঁ করছে। ফাঁকা শূন্য ঘরদোর খুঁজে কোথাও নাচনেওয়ালী বউকে পাওয়া গেল না। ঘর তালাশে করে দেখা গেল- টাকাপয়সা, সোনাদানা যা যৎসামান্য যা ছিল সবকিছু নিয়ে নাচনেওয়ালি পালিয়েছে! আদতে সে পালানোর জন্যেই চকিদারের ঘরে এসেছিল, সংসার করতে নয়। এরা পালিয়ে বেড়ায়, ঘরসংসার এদের টানে না, বাইরের জন্যে মন পোড়ে। চকিদারের মোটাবুদ্ধিতে তার নাগাল না পেলেও গাঁয়ের অনেকে তা বিয়ের দিনই বলাবলি করছিল।
এরপরেও অবশ্য চকিদার হাতপা গুঁটিয়ে বসে থাকেনি, রবার্ট ব্রুসে’র মতো বারংবার চেষ্টা সে করেই গেছে। আরও দু’দু’টো বিয়ে সে করেছে। তারাও শেষ পর্যন্ত চকিদারের সংসারে স্থায়ী হতে পারেনি। বোধকরি তার ললাটে সৃষ্টিকর্তা স্ত্রীভাগ্য বলে কিছু লিখেননি অবশ্য দেরিতে হলেও এ-রুঢ়সত্য সে অনুধাবন করতে পারে। এবং এরপর বিস্মিত ব্যাপার হলেও সত্যি যে বিয়ের নেশাটা তার পুরোপুরি কেটে যায় এবং সে দর্শনশাস্ত্রজ্ঞের মতো কতক ভারি কথা যত্রতত্র বলে বেড়াতে শুরু করে, যেমন - মেয়েমানুষে আদতে কোন সুখ নাই, বৃথাই টাকাপয়সা জলে ফেলা ! লোকে অবশ্য বলছে ভিন্নকথা, ওসব সত্যমিথ্যা হতে পারে, তাছাড়া বয়সও তখন তার আর বিয়ের পক্ষে নেই, ওদিকে আগাম নানান রোগব্যাধি শরীরকে পুরোমাত্রায় ঘায়েল করে তুলেছে। এরপর দেহমনের অসুখ তাকে এমনমাত্রায় কাবু করে যে চৌকিদারের মতো এমন কঠিন দায়িত্ব পালন করা তার জন্যে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না পেয়ে সে একমাত্র ছেলেটাকে পলানের এককানি জমি বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দিয়ে সরকারি কাজ থেকে ইস্তফা নেয়।
ছেলে মাসশেষে বেতনের প্রায় পুরো টাকাটাই বাবাকে পাঠিয়ে দেয়। চকিদার পশ্চিমা বিলিয়নারদের মতো তা সুদের বাজারে বিনিয়োগ করে। সুদের বাজারে লোকসানের ঘানি টানতে হয় না, সবকালেই চড়তি থাকে। গাঁয়েরলোকের অভাবের শেষ নেই। একগড়া প্রায় সকলকে এক আধবেলা খেয়ে, না-খেয়ে দিন পার করতে হয়। সারাবছর কঠিন পরিশ্রম করেও দু’বেলার ভাত জুটানো মুশকিল হয়ে পড়ে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ,সে-তো জিয়লের আঠার মতো লেগেই আছে। এবছর অনাবৃষ্টি তো ফিবছর অতিবৃষ্টি। অভাবে কারো কাছে হাতপাতার জোগার নেই। সবার পাতের প্রায় একই দশা !
এমন মোক্ষম সুযোগ কাজ লাগায় কুচুটে চকিদার। এ-তল্লাটে কার মেয়ে আইবুড়ো হয়েছে, কোন ছেলে লায়েক হয়ে কাজকারবার না করে বখাটে হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে কিংবা কারে যমরোগে ধরেছে এসব তথ্যাদি চকিদারের চাটুকাররা তার বাংলাঘরে প্রতিদিনকার গাঁজা-মদের আসরে বলাবলি করে।
আজও সে রূপে,ছবদের আলীর আইবুড়ো মেয়েটাকে নিয়ে বিভিন্ন কু-কথা তার কানে আসে। চকিদার শিকার খোঁজে পায়, তার চোখজোড়া ধূর্ত শিয়ালের চোখের মতো চকচক করে ওঠে। তড় সয় না। কোনমতে রাতটা কাটে, সূর্য না উঠতে সে দোর খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। উত্তরের উঠোনের নিমগাছটায় নিচে এক আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার তখনও জমা হয়ে আছে। চকিদার কাঠের খড়ম পায়ে খটখট আওয়াজ তুলে ভোরের নিস্তব্ধতাকে পাশ কাটিয়ে নিরীহ নিমগাছটার দিকে তেড়ে যেয়ে এবং জন্তু-জানোয়ারের স্বভাবের মতো কঠিন আক্রোশে একটি ডাল টেনে ছিঁড়ে গতরাতের আধোয়া বাসি- হলদেটে দাঁতে ঘষতে ঘষতে বাড়ির বাইরে পা বাড়ায়।
ছবদের আলীর মেয়েটার বয়স বিশ পেড়িয়েছে গত বৈশাখে। তার হাঁটুরবয়সী মেয়েদের বিয়ে হয়ে কোলেকাঁখে দু’চারজন করে বাচ্চাকাচ্চা ঝুলছে অথচ মা-মরা এই মেয়ের কপালে কানাখোঁড়া একজন স্বামীও জুটল না! ছবদের আলীর থইলা-ঝারা মেয়েটা রেখে বউটা সেই কবেই গোরে ঠিকানা নিয়েছে। মহিলা আগাগোড়া স্বার্থপর। অন্তত ছবদের আলী তাই মনে করে। না-হলে শেষবয়সে এসে এমন একটা মেয়ের জন্ম দিয়ে তার ঘাড়ে ফেলে ফাঁকি দিয়ে চলে যায় নাকি! ছবদের আলী, এই মেয়ে-মেয়ে করে আরেকটা নিকার হাউস থাকলেও মুখে কখনো সেকথা তুলতে পারেন নাই। মেয়েটা তার চোখেরকাঁটা। মেয়ের কারনে নিজের জীবনে সাধ-আহ্লাদ জোটেনি। মেয়েটার বিয়ে তো দূরেরকথা একটা পাকাপোক্ত সম্বন্ধও আসে না অথচ দেখতে শুনতে মেয়েটা একদম বাতিলের খাতায় ফেলার মতোও নয়। মায়ের মতো চোখ-নাক খাড়া খাড়া, গায়ের রঙ যদিও রোদেতাপে পুড়ে এখন একটু বসে গেছে নাহলে দশজনের সাথে দাঁড়ালে চোখে পড়ার মতোই ছিল। ছবদের আলী অবশ্য অতোটা অবুঝ নন। মেয়ে আইবুড়ো, তা সে শুধু মেয়ের কপালের দোষে নয়, তা তিনি বুঝতে পারেন ! নিজের দায় মুখ ফুটে না বললেও বিবেকের তাড়সে রাতের ঘুম উবে যায়। প্রায়ই তাকে রাতের অন্ধকারে বাইর বাড়ির কড়ই গাছের নিচে বউটার গোড়ের পাশে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়।
একসময়ে তিনি গাঁয়ে পৌরত খাটতেন। বউটা চলে গেলে মেয়েকে দেখাশুনা করার কেউ রইল না। কাজ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ল। একা নিঃসঙ্গ মানুষের মনেরজোর দিন দিন কমে আসে, ওদিকে বয়সও তো বসে নেই,সমানতালে বাড়ে, শরীরের শক্তি ক্ষয় হয়। একসময় শরীর আর কঠিন পরিশ্রম কুলোতে পারে না। নানান রোগে কাবু করলে- বাবার কালানের একফালি জমি ছিল তা বিক্রি করে কোনমতে টেনেটুনে বাপ-বেটির সংসার চলল এতকাল। এখন বলতে গেলে চেয়েচিন্তে এবং মেয়েটা পরের বাড়ির কাঁথা সেলাই করে যা পায় তা মিলিয়ে এক আধবেলা খেয়ে না-খেয়ে দিন যায়। এমন ঘরের মেয়েকে বিয়ে করার সাহস দেখায় এমন ছেলেপুলে এ যুগে পয়দা হয় নাকি !
রফিক চকিদারের নজর পড়ে ছবদের আলীর ভিটেটার উপর। যেমন পড়েছিল মাঝের পাড়ার খুদা বক্সের ধানি জমিটায়। জমিটায় আসলেই সোনা ফলত! আধ কাঁচাপাকা ধানে জমিটা ভরে উঠলে চোখ ফেরানো দায় ছিল। সেদৃশ্যে চকিদারের চোখদুটো রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ানো ধূর্ত শিয়ালের লালচোখের মতো কচকচ করত। তবে ধানীজমিটা বেশ সহজেই তার হাতে চলে আসে। যেন সৃষ্টিকর্তা তার চাওয়ার মতো করেই সব সাজিয়েগুছিয়ে হাতে তুলে দিয়ে গেল। খুদা বক্সের বউটা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মরল। অবশ্য এর মরার কথা ছিল আরও সকালে। একে তো সূতিকা রোগী তার উপর বছর বছর পোয়াতি হত। শরীরের মাংস শুকিয়ে হাড্ডির সাথে মিশে আমসির মতো দেখতে হয়েছিল। এমন শরীরে পোয়াতি তাও আবার বছর বছর, বাঁচে কী করে! সেবছর পোয়াতি হলে সরকারি- স্বাস্থ্যআপা বাড়ির পরে এসে তাকে দেখে গেল। এবং খুদা বক্সকে সম্মুখে বিপদের হুশিয়ারী দিয়ে যায়। বউটার বর্তমান দশায় অবশ্য বেচারা নিজেও চরম আতঙ্কের মধ্যে আছে। ওদিকে ঘর ভর্তি পোলাপান, সংসারে কাজকর্মের অন্ত নেই। বউটার গায়ে একফোঁটা বল নেই তারপরও বাধ্য হয়ে সংসারের কাজকর্ম করতে যায়, মাঝেমধ্যে দেখা যায় বেহুঁশ হয়ে উঠোনের কোণাকাঞ্চিতে পড়ে আছে। উপায়ন্তর না পেয়ে শেষে খুদা বক্স কামকাজ বাদ দিয়ে ঘরের কাজে হাত লাগায়। দিন ঘনিয়ে আসতে অবস্থা আরও বেগতিক হয়। স্বাস্থ্যআপা জানায় যে করেই হউক শহরে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে।
অতপর খুদা বক্স চকিদারের টোপ গিলতে বাধ্য হয় - স্ট্যাম্পে শর্ত মেনে টিপসই দিয়ে টাকা নিয়ে বউকে চিকিৎসা করায়। বউটার অবশ্য শেষরক্ষা হয় না- মৃত সন্তান জন্ম দিয়ে সাতজন নাবালক সন্তান ঘরে রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়। খুদাবক্স পড়ে বিপদসমুদ্রে। এতগুলো বাচ্চাকাচ্চার দায় দায়িত্ব পুরুষ মানুষের একা হাতে কুলানো সম্ভব নয়, অবশেষে সে অনেকটা বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে। বছর না ঘুরতে নতুন বউও পোয়াতি হয়। এবার সে চকিদারের কাছ থেকে জমিটা বন্ধক রেখে টাকা আনে। চকিদার সুযোগ বুঝে বন্ধকনামায় সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারলে পাওনাদারকে জমি বুঝিয়ে দিতে হবে এমন শর্ত তাকে না জানিয়ে স্ট্যাম্পে জুড়ে দেয়। নিরক্ষর লোকের কাছে সাদা কাগজ আর কলমের ছোটছোট অক্ষরগুলোর আলাদা কোন অর্থ বহন করে না। সে না বুঝে স্বাক্ষর করে আসে। একসময়ে কাগজের শর্ত মতো জমিটা চকিদারের দখলে চলে যায়।
ছবদের আলীর ভিটেটাও সেরূপে পেতে হন্যে হয়ে ওঠে চকিদার। বড়ো খাস জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ভিটেটা। একপাশে সদরে যাওয়ার আঁকাবাঁকা, ছালওঠে যাওয়া ন্যাড়া-কুকুরের পিঠের মতো ছোপছোপ ইট-খসানো সড়ক- যার বেশিরভাগ ইট আশেপাশের বাড়ির ছঞ্ছাতলায় অবলীলায় ঠাঁই গেড়েছে- তাতে কি একসময়ে পাকা রাস্তা কিংবা সুরকি বিছানো সড়ক হওয়ার সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অপর পাশটায় কিছুকাল আগেও কলকলিয়ে বয়ে-চলা ইছামতি নদী। এখন অবশ্য নদীর কোন চায়চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। দু’পাশের গাঁয়ের ঘরগৃহস্থালীর নোংরা জমে জমে স্তূপ হয়ে নদী স্থির হয়ে আছে। নামেই নদী, তাতে না আছে পানি, না আছে স্রোত। স্রোতহীন এবং দু’পাশ থেকে দখলে সরু হওয়া নদীরগায়ে সারাবছর ধরে জমা আবর্জনার সাথে বৃষ্টিবাদলের পানি পচেগলে ভাগাড়ের মতো দুর্গন্ধ ছড়ায়। নদীর চলনপথে পাহাড়ের মতো উঁচুউঁচু সড়ক তৈরি করে সাপ যেমন আস্ত ব্যাঙ গিলে খেয়ে সাবার করে দেয়, নদীগুলোকে তেমন করে ভূ-দখলবাজরা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। অবশ্য চকিদারের কাছে ইছামতী নদীর এমন হাল, শাপেবর হয়ে ধরা দিয়েছে- কোনভাবে ছবদের আলীর ভিটেটা নিজ আয়ত্বে নিতে পারলে, গাঁয়ের চেয়ারম্যানকে ক’টাকা ধরিয়ে দিয়ে মড়া নদীতে মাটি ফেলে জুতমতো ঘরদোর করা যাবে। তার নিজের বাড়ি বেজায়গায়, বর্ষাকালে প্যাঁককেদায় ডুবে থাকে উন্নাকালে সামান্য বৃষ্টি হলে বাড়ির বাইরে পা বাড়ানোর জো থাকে না।
যেই ভাবনা সেই কাজ। চকিদার কাঠের খড়মজোড়া দুপায়ে গুঁজে চিলের মতো নিশানার খোঁজে এই ভোর বিহানে খট খট আওয়াজে ছবদের আলীর বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে। তার বাড়ি থেকে বেশিদূরের পথ নয়। মিনিট বিশেক হাঁটাপথ।
চকিদার একদলা নিমের তিতে থুথু দু’দাঁতের ফাঁক দিয়ে উঠোনের মাঝে ছুড়ে ফেলে ছবদের আলীর নাম ধরে হাঁক দেয়। সবে ভোরের নীলআলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশটা এখনো আবছা আঁধারের ছায়ে ঢাকা দিয়ে আছে। ছবদের আলীর মেয়েটা আনমনে অগোছাল কাপড়ে উঠোনের এককোণে বসে গতকালের বাসি গোবর পাটখড়ির গায়ে জড়িয়ে মুইঠা-ঘসি বানাতে ব্যস্ত। চকিদারের হাঁপানি রোগীর মতো ফ্যাসফ্যাস গলার আওয়াজ কানে আসতে অতিদ্রুত সে কোমরেগোঁজাআঁচল টেনে বুকপিঠ ঢেকে নেয়। কিন্তু এরআগেই চকিদারের শকুনিচোখের লুলুপদৃষ্টি ওর বুক অবধি পৌঁছে যায়। পোকাখাওয়া হলদেটে কদাকার দাঁতে হনুমানের মতো খিলখিলিয়ে হেসে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যায়। চকিদারের বিয়ের খায়েশ ভাগ্যের পরিহাসে দমে গেলেও নেত্র-ক্ষুধা সময়সুযোগ বুঝে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ছবদের আলীর মেয়েটা দাদার-বয়সী এমন লোকের কুদৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পরনে তাঁতের শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে কলারথোরের মতো তড়িঘড়ি করে দেহটাকে গুঁটিয়ে নেয়, সেইফাঁকে ছবদের আলী ঘুমচোখে দাওয়ার পরে এসে দাঁড়ায়।
রফিক চকিদার তার সুদের হিসেব নিকেশের লাল খেরোখাতাটি একদণ্ডও চোখের আড়াল করে না। মানুষের বেঁচে থাকার একটি জুতসই অবলম্বন লাগে, যার নেশায় বহুকাল বেঁচে থাকার স্পৃহা জাগে। চকিদারের বাঁচার সেই যক্ষেরধন এখন এই খেরোখাতাটি। তার সুদের ব্যবসা রাতারাতি গরম হয়ে ওঠে। চারগাঁয়ের লোক বিপদে পড়তে তার কাছে ছুটে আসে। সে বাইরবাড়ির কদম গাছটার তলায় সেই খাতা হাতে সকাল সকাল বসে পরে। তার ধূর্ত কয়েকজন সহযোগী আছে। পাকা কাঁঠালের ছাল খসালে মাছি যেমন ভোঁ-ভোঁ শব্দে কাঁঠালের চারপাশে ভনভন শব্দে ঘুরে বেড়ায় তদ্রুপ চকিদার যখন গাছেরতলায় হাতল-চেয়ারে আয়েশ করে বসে থাকে, এরা চতুর্দিকে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে।
মেয়ের বিয়ে, বেকার ছেলেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর বাসনা কিংবা মরণ রোগের চিকিৎসা নিতে শহরে যেতে বাড়তি টাকার যোগানদাতা- চকিদার। শুরুতে চড়া সুদে টাকা নিয়ে বিপদের আভাস পাওয়া যায় না, তখন প্রয়োজন মেটানো বড়োবেশি মূখ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু চেতন যখন ফেরে তখন নিঃস্ব হওয়া ছাড়া বাকি কোন পথ খোলা থাকে না। মানুষগুলো অথই গভীরে পড়ে হাবুডুবু খায়। ঘরবাড়ি জমিজিরাত হারিয়ে হাহাকার করে।
ছবদের আলীর ভিটেটা হাতাতে চকিদারের লোকেরা বিশেষ কৌশল আঁটে- পদ্মাপাড়ের এক বয়োবৃদ্ধকে তার আইবুড়ো মেয়ের জন্যে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসে। বৃদ্ধের বউ পরপারে গেছে তাও অনেক বছর হয়। ছেলেমেয়েরা আলাদা ঘর বেঁধেছে। বৃদ্ধকে দেখভাল করতে কেউ নেই তাই বিয়েটা জরুরি। ছেলেমেয়েরা শক্তসামর্থ্য কোন মেয়েলোকের সন্ধানে আছে। সে খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে চকিদারের চ্যালাদের কানে আসে। তারা দ্রুত ঠিকানা মতো হাজির হয় এবং ঘাটেমরা বৃদ্ধকে দেখে এসে বিয়ের দিনতারিখ পাকাপোক্ত করে আসে। বৃদ্ধের বিষয়সম্পদ বলতে পদ্মাচরে চার শতাংশের উপর একচালা শতবর্ষীর শেষদন্তের মতো নড়বড়ে ভাঙাচুড়া একখানা ঘর। বাকি বিষয়সম্পদ ছেলেরা আগেভাগেই ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। দলিলে অবশ্য এই চার শতাংশের ভিটে বৃদ্ধের মৃত্যুর পর মেয়েদের দখলে যাবে তা স্পষ্ট করে লেখা আছে।
ছবদের আলীকে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধের ব্যাপারে সকাল সকাল খবর পাঠাতে সেও বড়ো আশা নিয়ে চলে আসে। সেদিন চকিদার নিজ দায়িত্বে ছবদের আলীর মাথার বোঝা বিশবছরের এইবুড়ো-মেয়েকে নামাবেন বলে কথা দিয়ে এসেছেন। চকিদার হাতল-চেয়ারে বসে বাঁ-পায়ের ওপর ডান-পা তুলে ক্ষীণভাবে দোল খায়। ওদিকে ছবদের আলী তার পায়ের কাছে জলচৌকিতে বসে মাথা উঁচিয়ে আকাশ দেখার মতো করে চকিদারের মুখপানে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন। চকিদার ডানে হাতটা শূন্যে বাড়ালে কেউ একজন তার সকালের পানটা হাতে ধরিয়ে দেয়। তিনি আয়েশ করে পান মুখে পুরেন। হাতের ইশারায় বাকীদের দূরে যেতে নির্দেশ করেন। এরপর গলা ঝারতে দুএকবার খাঁকারি দিলে ঠোঁট বেঁয়ে পানেরপিক থুতনীর দাঁড়িতে লেগে থাকে। ওদিকে ছবদের আলীর যেন তড় সয় না।
মেয়ের এ বিয়েতে ছবদের আলীর অমত করার উপায় থাকে না। নিজের হাতে এক কানাকড়ি নাই, বিয়ের পুরো খরচপাতি চকিদার স্বেচ্ছায় দিতে রাজি হয়েছে। তাছাড়া নিজের শরীর স্বাস্থ্যের বেহাল অবস্থা। রোগশোকে আজ যাই কাল যাই অবস্থা! কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না। তার অবর্তমানে মা-মরা মেয়েকে দেখার এ ভুবনে কেউ নাই, বারো ভূতে ঠুকরে খাবে মেয়েটাকে। এখন তিনি বেঁচে আছেন তারপরও কতো যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে মেয়েকে যেতে হচ্ছে। গাঁয়ের লোক মুখের উপর নানান কথা শুনিয়ে দেয়। গাঁয়ের জোয়ান ছেলেপুলেরা কুপ্রস্তাব দেয়। রাতের বেলা ঘরের চালায় ঢিল মারে, বদমাশ বেটাছেলেরা। মেয়েটা আড়ালে আবডালে কাঁদে। তিনি খাঁচার বন্দি পাখির মতো ছটফট করেন- না আছে টাকা না আছে গাঁয়ের জোর।
মেয়েটা খুব করে কাঁদছিল, আষাঢ়ে ঢলের মতো অঝোর ধারায়। দাদার বয়সী লোককে স্বামী হিসেবে মানতে মন সায় দেয় কার! ছবদের আলীর বুকটাও হুহু করে, মনের-দেহে ঝড় নামে। মা-মরা মেয়েকে সেই দুই বছর বয়স থেকে একহাতে বড় করলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত মেয়েটাকে একটা ঘাটের মরা বুড়ার গছাতে হবে। তার নিজের ভেতরটায় কী হচ্ছে তার তো দেখাবার উপায় নাই! তিনি নিজেকে চেপে রেখে- মেয়েকে সান্ত্বনা দেন- স্বভাবচরিত্রে লোকটা মন্দ নয়, তাকে নিরাপদে রাখবে। এবং এক শুক্রবারে বৃদ্ধের সাথে মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের যাবতীয় খরচপাতি বলতে গেলে ছবদের আলীর অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটু বেশিই করা হয়, যা চকিদার নিজ তদারকিতে করে। চকিদার অবশ্য কায়দা করে আসল কাজটা একফাঁকে সেরে নিয়েছে! ছবদের আলিকে কৌশলে বিয়েরবাড়ির হট্টগোলের ফাঁদে ফেলে সাদা কাগজে একটা স্বাক্ষর নিয়ে নেয়! দেখা যায় মেয়ের বিয়ের ছ’মাসের মাথায় ছবদের আলীর নিচু ভিটেয় মাটি পরে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে উঠে, বসতবাড়ির সীমানাও চারপাশে ডালপালা ছড়ায় এবং সেখানে চকিদারের শখের লাল দালানের কাজ শুরু হয়।
নববধূকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর মতো করে চকিদার লাল খাতাটিকে বুকের কাছে শক্ত করে ধরে ঘুমুতে যায়। তাতে সে চরম সুখ অনুভব করে। মাটির নেশাতুর সোদা গন্ধের মতো নেশাধরা ঘ্রাণ জড়িয়ে আছে লাল মলাটের খাতাটা জুড়ে। কী আশ্চর্য- খাতাটা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নেও আসে। ইদানীং একটা বিদঘুটে স্বপ্ন তাকে বড়ো জ্বালিয়ে মারছে। কে বা কারা, স্বপ্নে ঠাহর করে উঠতে পারে না, তবে সে বুঝতে পারে এরা তার কাছের লোক, খাতাটি তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। দু’পক্ষই খাতাটি নিয়ে বড্ডবেশি টানাটানি করে। এবং এমন কড়া শীতের রাতেও সে ঘেমে ভিজে চুপচুপা হয়ে জেগে ওঠে, এমন দুঃস্বপ্ন এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুম ভাঙ্গলে বাকি রাত আর ঘুম হয় না। আজও তার ব্যত্যয় হয় না। সে হারিকেনের আলো চেতিয়ে খাতাটা খুলে বসে। কালো কালির বিন্দু বিন্দু অক্ষরে অজস্র অভাবী মানুষের নামে ভরে উঠেছে খাতাটি।
বাইরে জাঁকালশীত বইছে-টিনেরচালে টুপটাপ শিশির ঝরার শব্দ কানে আসতে চকিদারের মধ্যে কেমন যেন ভাবের উদয় হয়, তার হাতেধরা খাতাটির সাথে শিশির ভেজা টিনের চালাটির যেন বড়ো মিল খুঁজে পায়। সারারাতের ফোঁটা ফোঁটা শিশিরে টিনের চালাটা শেষ রাতে কানায় কানায় ভরে যায়। একসময় সূর্য ওঠে। কঠিন তাপ শুষে নেয় সমস্ত শিশিরকণা। তার খাতার পাতাগুলো শুরুতে ধবধবে শাদা শূন্য ছিল এরপর একের পর এক অভাবী মানুষের নামে প্রায় ভরে উঠেছে খাতা। তারপর! এটুকু ভাবতে বুকটা কেমন চৈত্যেরখরায় ফেটে যাওয়া মাঠের মতো হাহাকার করে উঠে। রাতের শেষপ্রহর অদ্ভুত কাল। কঠিন মানুষও এ প্রহরে নিজের কৃতকর্মের চাক্ষুষ ছবিখানা স্পষ্ট স্ফটিকের মতো করে দেখতে পায়। চকিদারের মনেরজ্বালা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত দেহজুড়ে। মাথাটা গরম হয়ে অসহনীয় যন্ত্রণাবোধ হয়, যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ফেটে আগুনের গোলা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। চুল-খসে পড়ায় জাম্বুরার মতো গোলগাল দেখতে মাথাটায় হাত রেখে সে চমকে উঠে, তপ্ত বালুর পরে হাত রাখলে যেমন বোধ হয় ঠিক তেমন অনুভূতি! ঘরটাকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে থাকা বদ্ধ গোরের মতো মনে হয়। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে দোর খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়। বাইর বাড়ির কড়ই গাছটার তলায় একদলা অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে,বাকি রাত সে গাছেরতলায় চুপচাপ বসে থাকে।
রাতের দুঃস্বপ্নরা দিনের আলোতে কিছুটা ম্রিয়মান হলেও চকিদারকে বেশ উতলা মনে হয়। চোখের নিচে ভাল্লুকের চোখের মতো নির্ঘুম চিহ্নের কালোরেখা ফুটে উঠেছে, দমে জোর নেই- গলার কাছে এসে শ্বাসটা কেমন যেন আটকে থাকে। পটকা মাছের মতো মুখ খুলে হা করে হাওয়া না নিলে বুকটা শান্ত হয় না। তারপরও তাকে খাতাটা বগলে চেপে লাল দালানের কাজ তদারকিতে ব্যস্ত দেখা যায়। ছবদের আলী ভিটে ছাড়া হয়েছে। তার ঠাঁই হয়েছে গাঁয়ের মসজিদ ঘরের বারান্দায়। মৌলভি সাহেব নিজের খাবারের কিছু অংশ তার পাতে তুলে না দিলে সারাদিন অভুক্ত দিন কেটে যায়। দিনরাত সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে কী যেন বলে। মাঝেমধ্যে দূর থেকে তার ভিটেখানা দেখে আসে যেখানে চকিদারের লালদালান তরতরিয়ে বেড়ে আকাশে মাথা তুলেছে। লোকে তাকে এখন অবশ্য পাগল বলেই জ্ঞান করে।
মাঘের হাড় কাঁপানো শীতের শেষ রাতে আকাশ ফেটে ঝুরঝুরিয়ে বৃষ্টি নামে, উত্তরীহাওয়া হু হু শব্দে তেড়ে আসে। বৃষ্টি থেমে বেলা করে সূর্য ওঠলেও তার তেমন তেজ নেই, হাওয়ার স্রোতে শীতের তীব্রতা তাই বেড়ে যায় বহুগুণে। চকিদার সারারাত ধরে জেগে আছে, শেষরাতে তাকে আধশোয়া হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বুকটা কামারের হাঁপারের মতো দ্রুত উঠানামা করছে। হা-করা মুখটা থেকে সাপের নিঃশ্বাসের মতো হুঁশহুঁশ শব্দে বাতাস বের হচ্ছে। শীতের কারণে বেশ বেলা হলেও গ্রামটা ঝিমিয়ে আছে। খুব প্রয়োজন না হলে কেউ ঘরের বাইর হচ্ছে না।
ছবদের আলী এ দুর্দিনে মসজিদ ঘরের বারান্দা থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে। গায়ে জড়ানো শীত তাড়াবার একমাত্র সম্বল সেই কবেকার মায়ের পুরনো ছেঁড়া শাড়িতে তৈরী জোড়াতালির কাঁথাটা। প্রতিদিনের মতো সজলচোখে দূর থেকে সে তার ভিটেটার দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু আজ সেখানে লাল দালানের কাজের কোন ব্যস্ততা চোখে পড়ে না। এমনকি হাতল-চেয়ারে আয়েশ করে বসে থাকা চকিদারকেও আজ সেখানে দেখা যায় না। সে দুরুদুরু বুকে একপা দু’পা করে, পা টিপেটিপে ভিটের দিকে এগিয়ে যায়। মানুষজন শূন্য বাড়ি। সে দখিনের উঠোনের কোণায় কতবেল গাছটার তলে যেয়ে দাঁড়ায়। একমাত্র এই কতবেল গাছটা ছাড়া তার ভিটের বাকিসব চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে। বাড়ির সীমানা বড় হতে হতে দিগন্তে যেয়ে যেন মিশেছে।
তার কাছে বাড়িটাকে স্বপ্নের মতো জায়গা মনে হয়। যেন সে কখনও এমন বাড়ি এর আগে কোথায়ও দেখেনি। ছবদের আলী পাগলের মতো তার ভিটের চিহ্নগুলোকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। মা-বাবা আর নিজের বউটা যেখানে চিরঘুমে আছে ঠিক সেইস্থানে মাতালের লাল চোখের রঙের চকিদারের দালানটা তার দিকে তাকিয়ে যেন উপহাস করছে। সে ছুটে যায় একচালা ভাঙাচুড়া ঘরটার কাছে- যেখানে মেয়েটাকে নিয়ে তার আঠারটা বছর একা নিঃসঙ্গ সংগ্রামে কেটেছে। নাঃ এখানেও কোন চায়চিহ্ন নেই। ভিটে ছুঁয়ে থাকা সেই ডোবাটা- বর্ষাকালে বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় পানি জমে কানায় কানায় ভরে ওঠত, থৈথৈ করত, উন্নাকালে সেই পানি দিয়ে চলত বাপ-বেটির সংসার। ঘাটলায় একটা বাঁশের মাচা ছিল, চোখে স্পষ্ট দেখতে পান- মেয়েটা টুকটুক করে গৃহস্থালি কাজ সারছে। টুকরো টুকরো এসব স্মৃতিগুলো ছাড়া তার কাছে আজ আর কিছু নেই। ছবদের আলী মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। উন্মাদের মতো সে বাড়িটার চতুরপাশে দৌড়াতে থাকে। একসময় ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে মাঝদুয়ারে হাঁটু গেঁড়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে। তার আহাজারির প্রতিধ্বনি লাল-দালানের অসমাপ্ত কামরাগুলোতে ধ্বনিত হয়ে হাওয়ার উপর ভর করে সারাদুনিয়ায় যেন ছড়িয়ে যায়। এবং একটা অসীম বৈরাগ্য তার আপন পৃথিবীটাকে ঘিরে ফেলে।
ওদিকে চকিদারের বেঢপা টেপাটোপা দেহখানা সোজা হয়ে বিছানার সাথে অনড়ে পড়ে আছে। বুকের উপর খেরোখাতাটা আধখোলা, দু’হাতে হয়তো শক্ত করে ধরা ছিল- হাতদুটো খাতা বরাবর ছেঁড়া-ত্যানার মতো ন্যাতিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। দেহটা হয়তো আগেভাগে মরে গেছে কারণ বয়সের কারণে তার পিঠে খানিকটা উটের কুজের মতো উঁচু ছিল-একারণে সে খানিকটা উপুর হয়ে হাঁটত, সেটার অস্তিত্ব এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে। মৃতদের শরীরের আঁকাবাঁকা অংশ দম উড়ে যেতে দ্রুত সোজা হয়ে যায়- তবে চকিদার কিন্তু এখনো পুরোপুরি মরতে পারেনি,দমটা তার টুঁটির কাছে এসে মাছের কাঁটার মতো আটকে আছে। মুখটা বড়োমাছের পেটির মতো হা হওয়া, বড়ো বিদঘুটে দেখাচ্ছে। এই শীতে সাধারণত মাছি দেখা যায় না কিন্তু চকিদারের মুমূর্ষু-বেলায় এরা কীভাবে খবর পেল কে জানে ! খোলামুখের চারপাশে মাছিগুলো ভনভন আওয়াজে ঘুরে বেরাচ্ছে। তার কোটরে-ডোবা চোখদুটো খোলা তবে পলক পড়ছে না, চোখেরপাতা খানিক পরপর হালকা বায়ে বাঁশপাতা যেমন শিরশিরিয়ে কেঁপে ওঠে সেরূপে কেঁপে কেঁপে উঠছে। চোখের কোণা বেঁয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে পড়ছে। শেষ সময়ে আপনজনেরা চারপাশ ঘিরে বসে থাকে, তাদের চোখে মায়াভরাঅশ্রু থাকে, কেউ বা মরণোন্মুখের হাতদুটো বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকে, যাতে মৃত্যুটা নির্ভার হয় কিন্তু এখানে তেমন কাউকে চোখে পড়ল না।
শেষ অবধি অবশ্য ছবদের আলীর পিছু-ছুটা ছেলেগুলো বিরামহীন দৌড়ে ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে চকিদারের বাড়ি এসে ভিড়েছে। ছবদের আলী নাকি ঘূর্ণিঝড়ের মতো নদীতীর ধরে মাঝের চরের মটর কলুই ক্ষেতের আল ধরে দৌড়ে নামার চকের ইরিবিড়ি ক্ষেত পেড়িয়ে দূরে বহুদূরে চোখের সীমানা পেড়িয়ে- কুয়াশার ভিড়ে হাওয়া হয়ে গেছে। এরপর এরা আর তার হদিস পায় নাই।
ফিরতি পথে চকিদারের বাড়ি এসে প্রায়মৃত শকুনকে ঘিরে দাঁড়কাকগুলো যেভাবে অধীর ব্যগ্রতা নিয়ে ওর মরে-যাওয়ার অপেক্ষায় ওকে ঘিরে থাকে সেরূপে চকিদারের মৃত্যুশয্যার চারপাশে এরা দাঁড়িয়ে থাকে। এদের চোখভরা কৌতূহল, মায়ার ছিটেফোঁটাও নেই ! অধীর আগ্রহ তাদের চোখেমুখে, অন্তিম শ্বাসটা দেখার তড় সয় না। এরা কোমর মাজা বাঁকিয়ে, গলাটা সারস পাখির মতো উঁচিয়ে বাড়িয়ে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঝুঁকে মায়াহীন অপলক চোখে চকিদারের মুমূর্ষু চোখজোড়ার দিকে দৃষ্টি রাখলে সহসা যেন তাদের কাছে চোখের সম্মুখে দৃশ্যমান বাস্তব দৃশ্যটা রাতারাতি বদলে যায়! বিস্মিত-চোখগুলোর কোণে ভেসে উঠে - অতি প্রগাঢ় ঘনআঁধারে ঢাকা একটি মরণকুয়া, তাতে একটি খোঁড়াশকুন পা পিছলে পড়ে যেয়ে বাঁচার জীবনমরণ যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে হেরে গেছে এবং মৃত্যুর মতো অসীম অন্ধকার অনিশ্চয়তার কাছে নিজেকে সপে দিয়ে মুমূর্ষুদৃষ্টিতে ( যে চোখের দৃষ্টি সইবার ক্ষমতা পৃথিবীর কাউকে দেওয়া হয় নাই) তাকিয়ে আছে !