banner

We love to create unique, successful templates for your websites

Countdown Timer Expired

Days
Hours
Minutes
Seconds
সমুদ্র বোঝ চোখের জল বোঝ না 

অরণ্য আপন

ভাই হামি তোমার বোন, হামি তোমার কুলসুম বুবু। মায়ের সে-ই নদীর হাওয়া লাগা কণ্ঠ, ধানের ক্ষেতের আইলে আইলে হাঁটা কণ্ঠ এখনও স্পষ্ট শুনতে পাই। ভাই তুমি ভালো আছ? মায়ের ফোন পেলেই শাকুর মামা ম্লান হয়ে যায়। বুবু আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছ? আম্মা মামির কথা পুছ করেন। শুভ ভাইয়ের কথা পুছ করেন। আম্মা নিজের কথা খুব কমই বলেন। যা বলেন শুধু মান্নত আপার কথা বলেন, মেয়ে হামার পড়ালেখার মাথা ভালো। মামা খুব বেশি কথা বলেন না। কুশল বিনিময় করে ফোন ছেড়ে দেন। মামির সামনে খুব একটা বেশি কথা বলতেও চান না। ফোন ছেড়ে দিলে মামি সঙ্গে সঙ্গে পুছ করেন, কে ফোন দিয়েছিল? আর বলো না, বুবু ফোন দিয়েছিল। আমারই তার খোঁজ নেওয়া উচিত। আমি তো নিতে পারি না। উল্টো সে আমাদের খোঁজ নেয়। লজ্জায় আমি কথা বলতে পারি না। মামা ঢাকা শহরে থাকেন। দীর্ঘ কয়েক বছর বিদেশে ছিলেন। বুয়েট থেকে পাশ করেই অস্ট্রেলিয়ায় চলে গিয়ে ছিলেন। মামি বলেন, বুবুজানের এত ফোন আমার কাছে ঠিক লাগছে না। দেখো কোনও মতলব আছে কিনা! তুমি লাই দিতে যেও না। মামির কথা শুনে মামা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। মামা ভাবতে পারেননি যে মামি একরকম কথা বলতে পারেন। দেখো শুচি, কুলসুম আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িতে থেকে আমি পড়ালেখা করেছি। খালা যদি আমাকে আশ্রয় না দিতেন আমার পড়ালেখা চাঙ্গে উঠত। হয়তো আজ কুলি মজদুর হয়ে জীবন কাটাতে হত। খালা মারা গেলে মাটি পর্যন্ত দিতে পারিনি। তখন আমি বিদেশে ছিলাম। তাদের ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। আমি এতদিন বেখেয়ালে ছিলাম। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া আমার উচিত ছিল। মামার চোখ ভিজে গেছে।
মামারা ছয় ভাই-বোন। মামা ছিল সবার ছোটো। সবাই বিয়ে-শাদি করে ভিনো হয়ে গেলে শাকুর মামা একা হয়ে যায়। ভাইয়েরা না দেখলে শাকুর মামা খালার বাড়ি গিয়ে থিতু গাড়েন। নানি তাকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করেন। দেশের অবস্থা তখন খুব একটা ভালো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা খা খা দেশ। মানুষের অভাব অনাটনের শেষ নেই। শাকুর মামার কষ্ট দেখে নানি নিজেই একদিন ডেকে বললেন, বাবা তুই আর তোর ভাইয়েগোরে সংসারোত থাকিসনে। ওটি[ওখানে] থাকলে তুই খালি খাটে মরবু। তোর পড়ানেখা হবিনে। কুলসুম হামাক কছে[বলল] যে তোর পড়াশোনার মাথা ভালো। শাকুর মামা সব ভাইয়ের ফাইফরমাশ খাটতেন। বাড়ির গোরুছাগল দেখা, বাজার করা। তবু পেটের ভাত জুটত না। কাজ-কামের চাপে দিনের বেলায় বই নিয়ে বসতে পারতেন না। রাতে যে একটু পড়তে বসবেন তাও পারতেন না। নেম্পুতে কেরোসিন তেল থাকত না। সারাদিন খাটুনির ওপর পিন্ডে যায় তবু পেটে ভাত পড়ে না ঠিকমতো। বাটা ভাতে তার পেট ভরে না। পেটে খিদে থেকেই যায়। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে কল চেপে পানি খান। মামা দেখলেন যে এভাবে তার চলছে না। তাকে টাকা কামাই করতে হবে। টাকা যার দুনিয়া তার। মামা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে একটা জুতোর দোকানে কাজ ধরলেন। তবু ভাই -ভাবীদের হকমদকম যায় না। একটা ভাঙাচোরা ঘরে চকির ওপর তার জীবন নড়েচড়ে। ভাঙা খিড়কি। উই ধরা বাঁশের বেড়া। চালের চুঁই দিয়ে পানি পড়ে বর্ষাকালে।
আম্মা আর মামা একই স্কুলে পড়তেন। একদিন হেডমাস্টার আম্মাকে ডেকে বললেন, শাকুর স্কুলে আসে না কেন? সে তো ভালো ছাত্র! তাকে স্কুলে আসতে বলবে।
আম্মা তো সবকিছুই জানেন। নানির কাছে সবকিছু খুলে বললেন। আম্মার কথা শুনে নানি মামাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে শাকুর মামা এখানেই থাকেন। এখানে যে খুব ভালো অবস্থা তাও না। নানির টানাটানির সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। কখনও নানি নিজের ভাগের খাবার মামার জন্য প্লেটে সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন আবার কখনও আম্মা নিজের ভাগের খাবার মামার জন্য রেখে দিয়েছেন। কোনোদিন রাতে  নানি না খেয়ে থাকতেন আবার কোনোদিন আম্মা না খেয়ে রাত কাটাতেন। মামা এসব টের পেতেন না। মামা মাথা খুন করে পড়াশোনা করতেন। পেটে খুব খিদে থাকত। যা সামনে পেতেন খেয়ে সাবাড় করে দিতেন।
মামা বারান্দার রেলিং ধরে আকাশের দিকে মুখ করে বলেন, আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে। কুলসুম বুবুকে আমি অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমি তার স্বপ্নের ফুলকে পায়ের তলে ফেলে পিষে দিয়েছি। দিইনি কি আমি? মুখটা ভাঁজ করে থুতু ফেলেন। থুতুটা যেন তার নিজের ওপর ছাড়লেন। একটা ঘেন্না ধরে গেল তার নিজের সত্তার ওপর। মামার সব ধরনের খেয়াল রাখতেন আম্মা। মামার যেন পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটে। মামার গোয়ার কাপড় পর্যন্ত  আম্মা ধুয়ে দিতেন। মাধ্যমিকের ফরম ফিল আপ করবেন, মামার কাছে টাকাপয়সা নেই। নানিরও একদম হাত খালি। নানি এর ওর কাছে যাচ্ছেন কিন্তু কোথাও থেকে ব্যবস্থা হচ্ছে না। এদিকে সময়ও ঘনিয়ে আসছে। আম্মা তখন এসব দেখে নিজের গালমুখ কামড়ে নিজের গলার চেইনটা কুরবানি দিয়ে দিলেন।
কয়েক মাসের মাথায় ফের আম্মা মামাকে ফোন দেন। ভাই হামি তোমার বোন, হামি তোমার কুলসুম বুবু। আম্মার গলা বুঝতে পারতেই মামা যেন হলদিল হয়ে পড়েন। ভালো আছ বুবু? বাচ্চাকাচ্চা ভালো আছে? মামাকে আম্মার এভাবে ফোন করা মান্নত আপুর একদম পছন্দ না। যে-মানুষ নিজে থেকে কখনও খোঁজ করেন না, তাকে কেন ফোন দিতে হবে? জোর করে আত্মীয়তা করার পক্ষে না আপা। আপা খুব নরম দিলের মানুষ কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব কখনও খাটো করবেন না। আম্মাকে ঝাড়ি দিয়ে আপু বলেন, মামু তো তোমাক[তোমাকে] একবারও ফোন দেয় না, তুমি তাক[তাকে] ফোন দেও ক্যা[কেন]? আপুর রাগের গলা। রেগে কথা বললে আপুর চেহারা মোবারক লাল হয়ে যায়। আম্মার মতো ধপধপে ফর্সা মানুষ আপু। যেন টোকা দিলে রক্ত গড়ে পড়বে। আম্মা সব কথা আপুকে বলতে পারেন না। তার মনের কোথাও একটা খটকা লেগে থাকে। বুকের মধ্যে একটা কানা গলি আছে, সেখানে আম্মাই শুধু কালো নীরবতার সঙ্গে হাঁটেন। এই পথে আর কাউকে দেখাতে চান না। বাবার কথা বললেই আম্মার জবান বন্ধ হয়ে যায়। বোবার মতো চুপ হয়ে যান। তখন আম্মাকে অনেক এতিমের মতো অসহায় লাগে। চোখটা ভাষাহীন লাগে যেন সেখানে কোনোদিন ভাষা পড়েনি। যেন কোনোদিন ও চোখ কথা বলেনি। অথচ আম্মার চোখ দেখলে মনে হত ও চোখ যেন ভাষার মানচিত্র। আম্মা বালিশের খোল লাগাতে লাগাতে বলে, হামার কি এই দুনিয়াত আর কেউ আছে? সোগলি[সবাই] তো চলে গেছে। এই ভাইডাই আছে। তার গলা শুনবের পালেও[পেলেও] কলজেডা ঠান্ডা হয়। আপা খচ করে উঠে বলল, উনকে ভাই থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। ঘরে আর থাকল না। কিন্তু বাইরে এসেও আপা থাকতে পারল না। আপা ভাবে যে আম্মা তার কথায় কষ্ট পেল না তো আবার? হেমন্তের বিকেলের বাতাসও বিষ হয়ে উঠল তার কাছে। ফের ঘরে গিয়ে পেছন থেকে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি যখন ফোন দাও, মামি সামনে থাকে, মামা অস্বস্তি ফিল করে। তুমি কিসক[কেন] বুঝো না আম্মা? আপার কণ্ঠ বিনয়ে নুয়ে পড়ে। যেন সেজদায় পড়ে খোদার সনে কথা বলছে। আম্মা চুপ করে থাকলেন, কিছু বললেন না। বাবার কথা পুছ করলেও আম্মা এভাবে চুপ করে থাকেন।
আম্মার শরীরটা খুব একটা ভালো না। আজ হঠাৎ করেই মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে গেছেন। ধরাধরি করে বিছানায় নিয়ে শুয়ে দেওয়ার পর মাথায় পানি ঢালল মান্নত আপা। আম্মাকে আপা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় কিন্তু আম্মা ডাক্তারের কাছে যাবেন না। ডাক্তারকে টাকা দিলে খাবে কি? সংসার চলবে কি? কয়েকমাস ধরেই আম্মার শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। আম্মার ধলা গায়ের রং কালো হয়ে যাচ্ছে। চোখের নিচে কালি পড়ে খাদের মতো হয়েছে। এই শরীর নিয়েও আম্মা সেলাইমেশিনের কাজ করেন। আম্মার হাতের কাম ভালো।  একদম নিখুঁত কাজ করেন। আশেপাশের গাঁয়ের মহিলারা আম্মার কাছেই কাপড় বানান।
নানি যখন বিছানা নিলেন, সংসারের হাল ধরার জন্য আম্মা সেলাইমেশিন ধরেন। স্কুলে পড়াকালীন আম্মা সেলাইমেশিনের কাজ শিখেছিলেন। স্কুল থেকে আসার পর বিকেলে বসেই থাকতেন। এই অবসর সময়ে পাশের বাড়ির খালার কাছে এই কাজ শেখেন৷ ভাগ্যিস শিখেছিলেন নতুনা সংসারের চাল-ডাল কেনা, নানির চিকিৎসার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে যেত। নানি বিছানা নিয়ে পড়লে শাকুর মামাকে আম্মা বেশি মিস করেছেন। মামা তখন এক দেশ হতে আরেক দেশে চাকরি করে বেড়াচ্ছেন। যে-দিন নানির ওষুধ কেনার পয়সা থাকত না, আম্মা  নানির পাশে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। নানি বুঝতে পারতেন যে আম্মা কেন কাঁদছেন। নানি বলতেন, কান্দিসনে মা! হামার কিছু হবাল্লায়[হবে না]। যার কেউ নাই তার আল্লা আছে।
মামা শহরের কলেজে পড়তে গেলেন। মাসে মাসে বাড়িতে আসতেন। তখন ফোনের যুগ ছিল না। বাড়িতে আসলেই শুধু আম্মার সঙ্গে কথা হত। বাড়িতে এসে দুই-একদিন থাকতেন। তারপর ফের চলে যেতেন। যাওয়ার সময় নানি মামার হাতে টাকা গুঁজে দিতেন। নানির আড়ালে আম্মাও মামার হাতে টাকা দিতেন। তখন আম্মা হাঁসমুরগি পালতেন। মামাকে টাকা দেয়ার জন্য কখনও  হাঁসমুরগি বেচতেন কখনও আবার হাঁসমুরগির ডিম বেচতেন। নিজের কলিজাটা যদি বেচতে পারতেন তাও বিক্রি করে হয়তো মামার জন্য টাকা জমাতেন। মামার নিয়তে আম্মা যেখানেই হাত দিতেন, সোনা ফলাতেন। নানি হাঁস-মুরগি পালতেন চান, হয় না। দেখা যায় যে  কখনও গাওড়া খায় আবার কখনও মানুষ খেয়ে ফেলে। গাওড়া খেলে তো বাড়ির আশেপাশে থেকে পাখাপুখো পাওয়া যেত কিন্তু মানুষ খেলে কিছু পাওয়া যেত না। আবার হাঁস ডিম পারে পুকুরপাড়ে, সে-ই ডিম নানির কখনই পাওয়া হত না। অথচ আম্মার হাঁস-মুরগি কখনই হারাত না। আবার তার হাঁস-মুরগি বাড়িতেই ডিম পাড়ত। চাং ভরা নানিদের কবুতর। কবুতরগুলো হাটবাজার থেকে কেনা নয়। কোথায় থেকে যেন উড়ে এসে নানিদের চাং এ বসতি গেড়েছে। সকাল-বিকাল কবুতরগুলো বাক-বাকুম করে যখন ডাকত, আম্মার কেবলই মামার কথা মনে পড়ত। আম্মার চুলের গোছা অনেক বড় ছিল। কোমরের নিচে এসে পড়ত। আম্মা চুলের গোছা এলিয়ে দিয়ে বসলে মাঝেমধ্যে দুই-একটা কবুতর আম্মার চুল মুখ নিয়ে খেলা করত। আম্মা হাইহুই করলেও শুনত না, আম্মাকে একটুও ভয় পেত না। আম্মাকে আর কে ভয় পাবে? আম্মা-ই সবার ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। বাড়ির খুলি ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। রাস্তার সাথেই আম্মাদের বাড়ি। গাঁয়ের বখাটে ছেলেদের ভয়ে ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ করে রাখতে হত। জানালা খোলা থাকলে জানলা দিয়ে উল্লুকেরা উলকিভুলকি পারত। এদের উৎপাতে নানি তো আম্মার পড়াশোনাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাইরে যেতে হবে না, ঝুট-ঝামেলাও পড়তে হবে না। ঘরে বন্দি থেকেও আম্মা খুব একটা রক্ষা পেতেন না। রাস্তা থেকে ঘরের চালের ওপর দিয়ে ঢিল ছুড়ত। ঢিলের সঙ্গে কাগজ বেঁধে দিত। এই কাগজে হরেক রকমের প্রেমের প্রস্তাবের রসালো কথা লেখা থাকত। আম্মা রাস্তাঘাটে বের হতেন না। যে-দিন বের হতেন, বের না হয়ে উপায় থাকে না, আম্মার মন বিষিয়ে উঠত। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরপট্টিতে খবর হয়ে যেত। অমনি ঘেউঘেউ শুরু হয়ে যেত। কলেজে পড়তেই বড় বড় ঘর থেকে আম্মার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে থাকে। অত সুন্দরী মেয়েকে ঘরে রাখা দায়। নানিও পাত্রস্থ করবেন কিন্তু আম্মা রাজি না। আম্মা কেন রাজি না তাও নানি ভালো করে জানেন। মামা হোস্টেল থেকে বাড়িতে এসেছেন। এরমধ্যে এক নানির এক আত্মীয় আম্মার বিয়ে নিয়ে এসেছে। ছেলেটা বিজিবিতে চাকরি করেন। বাড়ি সারিয়াকান্দি। সারিয়াকান্দির লোকজন বেশিরভাগ বিজিবিতে চাকরি-বাকরি করে থাকে। কয়েক সপ্তাহ আগে বিজিবিতে চাকরি-বাকরি করে এমন একটা ছেলের সঙ্গে আম্মার বান্ধবীর বিয়ে হয়েছে। সে-ই ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছে। বিয়ে করে বউকে নিয়ে হিলিতে চলে গেছে। সে-ই ছেলের বন্ধুই আম্মার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। নানি তো রাজি। আম্মাও মনে মনে ঢের খুশি। যাক দুজন বান্ধবী এক জায়গায় থাকা যাবে। আম্মা কাঁধের ওপর বেণি দোলাতে দোলাতে মামার কাছে যান। মামা সোজা বলে দিলেন, তুমি বিয়ে করলে এ-ই জীবন হামি রাখমু না। আম্মা ঠাস করে বললেন, ক্যা? কবুতরের বুকের মতো নরম একটা চাহনি চোখে ঢেউ তুলে বলেন, তুমি বুঝ না? প্রেমের জন্য ধনদৌলত লাগে না, এক চাহনিই যথেষ্ট।  আম্মা কিছু বলে উঠতে পারলেন না। চোখের ওপর হালকা ভাবভাষার একটা চাহনি ঝুলিয়ে দিলেন। আম্মা এই বোকা মেয়ের মতো এই চাহনিতেই পড়ে ছিলেন কিন্তু মামা পড়ে ছিলেন না। বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর থেকে মামা বদলে যায়। প্রেমের কবি গালিব বলে, মানুষ বদলায় না/ মুখোশ খোলে মাত্র। মামাও কি এতদিন মুখোশ পরে ছিলেন? নানির কোনও আপত্তি ছিল না। বেশ খুশিই হয়েছিলেন। মেয়ে হামার ঘরেই থাকবি। বিটিও হামার, জামাইও হামার। নিজের বোনের ছেলে, এ ঘরেই মানুষ হয়েছে, হামারি নুনভাত খেয়ে লেখাপড়া করল। নানি যার পর নাই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু বাগড়া বসালেন মামার ভাইয়েরা। তাদের কথা, ভাই হামার বুয়েটে পড়ে। তাক হামরা ইনকে হেন্নেবেন্নে ঘরত কিসক বিয়ে করামু? ভাইয়েক হামরা ডিসির বিটিক দিয়ে বিয়ে করামু। যখন ভাই সারাদিন খেটেও রাতে না খেয়ে শুতে হয়েছে, খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে টিউবওয়েলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে পানি গিলেছে, যখন ভাই পড়াশোনা ছেড়ে জুতোর দোকানে কাজ নিয়েছে, একবেলা খাওয়ার জন্য মামুনকামলা দিয়েছে তখন তাদের খবর ছিল না। এখন তাদের ভাইয়ের প্রতি দরদ উথলে উঠল। ভাইয়েরা যা-ই বলুক না কেন শাকুর মামা অটল ছিলেন। তাদের মুখের ওপর বলে দিলেন যে তিনি অন্য কোথাও বিয়ে করবেন না। মামার এই বাণীতে আম্মার মনে মামার জন্য জায়গা পাকাপোক্ত হয়ে যায়। ভাইদের সঙ্গে মামার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাচ্ছে দেখে আম্মা মামাকে ডেকে বলেন, হামাক[আমাকে] আপনার বিয়ে করা লাগবি নে, আপনি ভাইদের মনে কষ্ট দিয়েন না। তারা নিশ্চয় আপনার ভালো চায়। কে হামার ভাল চায় সেটা হামি জানি, মামা নিজের হাতের রেখার দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমার কওয়া[বলা] লাগবি নে। খালা যদি হামাক আশ্রয় না দিত, তুমি যদি ভালোবাসা না দিতে আইজ হামার আস্তাত[রাস্তায়] থাকা লাগলোহিনি [লাগত]। তাদের ভালোবাসা দেখে পাখিরা গাছের ডালে ফরফর করেছে, আকাশে নক্ষত্রগুলো ঢের আলোয় হাসিতে ভরে উঠেছে। নদীতে মাছেরা ঝাঁক বেঁধে উল্লাস করেছে। বাড়ির কবুতরগুলো রাত-দিন বাক-বাকুম ডেকেছে। ভাইয়েদের কি চোটপাট!  হামরা তোর মায়ের পেটের ভাই, হামরা কি তোর খারাপ চামু[চাইব]? হামরা যেডে কই সেডে শোন। খালার কি আছে? ওই ছাপরা ঘর ছাড়া আর কিছু নাই তার, তুই কিসক ওই ঘরত বিয়ে করবু? দুনিয়ার মানুষ জড়ো হয়েছে। বাড়ির উঠানে মানুষ আটে না। সারা গ্রামে হইচই পড়ে গেছে। তিন ভাইয়ের কাছে মানুষ ঠিপ হয়ে আছে। একেকজন একেকটা কথা বলছে। তাদের এই প্রেমের দুপদুপি থুপথুপি অনেক চাউর হল। এতে মামারই লাভ হল। তার বুয়েটে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল। আর আম্মা আগের চেয়ে আরও বেশি সংকুচিত হয়ে গেলেন। কাউকে মুখ দেখানোর জো নেই। লজ্জায় আম্মার মাথা কাটা যায়। মাওবিটি মিলে হামার ভাইয়োক কিবে [কিছু একটা] খিলেছে, জাদুটাদু মনে হয় করিছে। এসব কথা আম্মা হজম করতে পারে না। আম্মা বালিশে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে  কাঁদেন। নানি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, কান্দিসনে মা, হামাগোরে মনত কোনও পাপ নাই। আম্মাকে এভাবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একদিন অঝোরে কাঁদতে হল। যে-ই কান্না আম্মার চোখ থেকে মন থেকে কখনও থামেনি। যখন মামা শুচি মামিকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেন। বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর থেকেই শুচি মামির সঙ্গে মামার সম্পর্ক। নানি এই শোকেই বিছানা ধরেন। এই শোক আর নানি কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। খুব বড় একটা আঘাত পেয়েছেন। এই আঘাতের ধাক্কা নানি সইতে পারলেন না। এত ওষুধবড়ি তবু নানির আঘাত সারল না। মনের চোট বড় চোট। নানি মনে চোট পেয়েছিলেন। আম্মার সেকি কষ্ঠ! সারা দিন-রাত সেলাইমেশিন ঠেলেন। এ-ই ছাড়া আম্মার আর পথ ছিল না খোলা। নানির খেদমত করতে করতে আম্মাও চেহারা মলিন হয়ে যায়। মেশিন ঠেলানো শরীর।  ভালো খাদ্যিখাওয়া নেই। নিজেই আবার হাটবাজার করা, ওষুধপত্র কেনা, বাড়ির কাজ-কাম করা। নানি ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে পারে না। জবান অস্পষ্ট হয়ে গেছে।  তবে আম্মার বুঝতে অসুবিধা হয় না। নানি চাইতেন যে আম্মা যেন বিয়ে-শাদি করে নেয়। নানির এক ভাই থাকতেন গণকপাড়া। সেখানে খবর দেওয়ার কথা বললেন। নানির ভাই এসে আর নানিকে পেলেন না। নানি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
আম্মা কি যেন খুঁজছেন। টেবিলের কাগজের নিচে বারবার দেখছেন। বিছানার চাদর উলোটপালোট করছেন। সম্ভবত মামার ফোন নাম্বার তালাশ করছেন। নিশ্চিত মান্নত আপা মামার নাম্বারটা গায়েব করে দিয়েছেন। আপা চান না যে আম্মা মামার কাছে ফোন দিক, মামার বিরক্তির কারণ হোক। আম্মা সুরা ইখলাস পড়তে লাগলেন। সুরা ইখলাস পড়তে থাকলে নাকি হারানো জিনিস পাওয়া যায়।  আম্মা সমানে সুরা আওড়াচ্ছেন কিন্তু নাম্বার লেখা কাগজটা চোখে পড়ছে না। নাম্বারটা আমি কাগজে লিখে টেবিলে পায়ের কাছে ফেলে রাখলাম। আম্মা টেবিলের নিচে তাকাতেই দেখে ফেললেন। সুরা ইখলাসের ওপর আম্মার বিশ্বাসটা আরও গাঢ় হল। ফোনটা মামাই ধরলেন। ভাই, হামি তোমার বোন, হামি তোমার কুলসুম বুবু। ভাই হামাক বাঁচাও, হামার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। আম্মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমি মাটিতে ধপাস করে বসে পড়ি। বাবাকে তো বুদ্ধি হওয়ার পর দেখিনি। আম্মাকেও হারাতে হবে? আমার হাত-পা কাঁপতে থাকে। মনে হচ্ছে হাউত করে কেঁদে ফেলব। বাবা বলেন, কি বল বুবু? তোমার ওসব কিছু হয়নি, ডাক্তারদের হয়তো কোথাও ভুল হয়েছে। আমি তোমাকে ঢাকায় নিয়ে এসে বড় ডাক্তার দেখাব। তোমার কিচ্ছু হবে না বুবু। আমি তোমাকে নিতে আসছি। ফোনটা রেখে মামা শুচি বলে হাঁক ছাড়েন। মামি তড়িঘড়ি করে এসে দেখেন যে মামা হাঁপাচ্ছেন। শাকুর, কী হয়েছে তোমার? মামির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর। মামা নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, তুমি এক গ্লাস পানি দাও। মামা ঘেমে উঠছে। কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমছে শিশিরের কণার মতো।  আম্মার সঙ্গে যখনই কথা হয় মামার, পুরো অতীতটা মামার মাথার ওপর আকাশ হয়ে ভেঙে পড়ে। নিজের অপরাধবোধ তার গলা টিপে ধরে যে মামা নিশ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁশ করতে থাকে এবং তার দুই পা কাঁপতে থাকে। যেন তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে আর পা দুটো মাটির ভর পাওয়ার জন্য ছটফট করছে।
একটা অন্ধকার পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। না জানি কোন আলোর মুখ কালো করে দেয়।
বাড়িতে মা-বাবা কেউ নেই। বাবা আম্মাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছেন। আম্মার কয়েকদিন ধরে শক্ত বুখার। আম্মার শরীর এত গরম যে আমি আম্মার বুকের দুধ খেতে পারছি না। আপার কোলে আমাকে রেখে ডাক্তার দেখাতে গেছেন। আমি কান্না করতেছি। একবার নিজের আরেকবার আপার হাত মুখে নিয়ে চাটছি। খিদেয় আমার জান বের হয়ে যাচ্ছে। যতটা খিদেটা বেশি হচ্ছে ততটা জোরে কান্না করছি। কান্নার আওয়াজ থেকে থেকে বড় হচ্ছে। একটুপর দেখি গোরুও হাম্বাতে শুরু করল। বেচারা গোরু, তাকেও খিদে লেগেছে। সকাল থেকে মনে হয় সোত্তা দেওয়া হয়নি। বাড়িতে আম্মা নেই, কে দেবে? আপা তো আমাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আমাকে কোল ছাড়া করলে কান্দে বাড়ি মাথায় তোলব। এইজন্য আমাকে কোল থেকে নামানোর চিন্তা আপা মাথায় নিয়ে আসেনি। সন্ধ্যার আগে আগে তারা আসলেন। সন্ধ্যার সমস্ত অন্ধকার যেন তাদের মুখে জড়ো হয়েছে। আম্মাকে দেখেই আমার কান্না থেমে গেল কিন্তু ফুঁপানো বন্ধ হল না। কান্দে না আমার বাবা, লক্ষীসোনা কান্দে না, হামি আসিছি তো! পাও ধরি তোমার, কান্দে না বাবা। আম্মা আমাকে বুকের ভিতর নিলেন। বাবার তিরিক্ষি মেজাজ। জোরের ওপর চিল্লাচিল্লি করছেন। বাবার এমন মেজাজ দেখে আপা টুলটুল করে আম্মার দিকে তাকিয়ে আছেন আর আমি আপার দিকে তাকিয়ে আছে। তড়ংবড়ং করে বাবা ফের ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। ফিরলেন অনেক রাত করে। বাবা ঘরে ঢুকতেই বিশ্রি একটা গন্ধ পাওয়া গেল। আম্মা শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক চেপে ধরলেন। রাতে বাবা আলাদা বিছানা করে শুয়ে পড়লেন। সকালে উঠে মুখে কিছু না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন আর ফিরলেন না। বাবার ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া আম্মা দেখলেন। আম্মার তো সারা রাত চোখের পাতা এক করেননি। অন্ধকারের সলতে পুড়েছে মনের আগুন দিয়ে। চেয়ে চেয়ে কেটে দিয়েছেন কুয়াশা মাখা রাত। আম্মা ভেবেছেন যে বাবা হয়তো ঝাড়া ফিরতে গেছেন। ফজরের আজান হয়ে গেল দরজার খিলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে। বাবা নামাজ রোজার পাবন্দি। আম্মা ভাবলেন যে বাবা হয়তো মসজিদে গেছেন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে। ভোরের আলো যত ফোটে আম্মার মনে তত অন্ধকার জমাট বাঁধে। বাঁশেরথোপে পাখি কিচিরমিচির করে। খুলি ভরে গেছে হাঁসমুরগি দিয়ে। রাস্তা দিয়ে ভ্যান সাইকেলের বেল বাজার শব্দ হচ্ছে। আম্মা কলেরপাড় থেকে বাসি থালাবাসন ধুয়ে আম গাছের ডালের খড়ির ওপর শুকানোর জন্য শুয়ে দিলেন। হাতের কাজ শেষ হয়ে যায় বাবা তবু আসে না। সকাল বড় হয়ে শাদা হয়ে গেল আর আম্মার মুখ শাদা থেকে কালো হয়ে গেল তবু বাবা আসলেন না।
তখন মামা গ্রামে ছিলেন। গ্রামে অনেক ভিটেমাটি-জমিজমা কিনে ফেলেছেন। এসবের দলিলদস্তাবেজ ঠিকঠাক আছে কিনা এসব দেখছেন। মামার আসার ঢের দিন হয়ে গেছে। মামা আর যাচ্ছেন না। গ্রামের মানুষ বলাবলি করছে যে তার আগের প্রেম মনে হয় জাগ্রত হয়ে উঠেছে। এইজন্য সে গ্রাম ছাড়ছে না। বিদেশের কাঁচা পয়সা রেখে এই গাঁওগ্রামে কেন সে পড়ে থাকবে? আসলে সে আবার মধুর গন্ধ পেয়েছে। এই দুবদুদি থুপথপি উঠার কয়েক দিনের মধ্যে আম্মা বেমার হয়ে পড়েন। বাবা যখন লাপাত্তা হয়ে গেলেন, মানুষ তখন আবার বলাবলি করতে লাগল, রাস্তাঘাটে বউয়ের দুপদুপি থুপথুপির কথা শুনে কোন পুরুষ মানুষ ঠিক থাকতে পারে? সইতে না পারে বউছোল রেখে চলে গেছে। এসব কথা বাতাসের আগে আগে হাঁটে। গ্রামের বউজিরা এসে আম্মাকে বলে, ও মান্নতের মাও তোমার সোমি[ স্বামী ] বলে বাড়ি ছাড়ে চলে গেছে? তোমার বলে কাবার সাথে সম্পর্ক আছিল, সেল্লে বলে লোকেরা কওয়াকয়ি করছে, এল্লে শুনে বলে লোকটা বাড়ি ছাড়ে চলে গেছে? আম্মা কাউকে কিছু বলেন না, শুধু কান পেতে শুনে যান আর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে কান্নাকাটি করেন। মামার ভিসা হচ্ছে না বলে যেতে দেরি হচ্ছে আর মানুষ কিসের মধ্যে কি জোড়াতালি দিয়ে গাল-গল্প তৈরি করছে৷ আম্মার চোখের পানি ফুরায় না। চোখ দুটো যেন বর্ষার আকাশ। সারাক্ষণ ঝরঝর করে ঝরতেই থাকে। ডাক্তার যখন বাবাকে ডেকে নিয়ে বললেন, আপনি রুগীর কে হোন? বাবা বলেন, সে আমার ওয়াইফ। তাহলে আপনাকে বলা যায়, ডাক্তার বলেন, আপনি শক্ত হোন, আপনার ভেঙে  পড়া যাবে না কিন্তু! আপনার ওয়াইফের ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। বাবা খুব ভয় পেয়ে যান। তখনই বাবা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেন। হাসপাতাল থেকে আসার সময় বাবা আলাদা রিকশায় চেপে এসেছেন। বাবার মুখটা আমি মনে করতে পারি না। জানি না কোথায় আছেন? কেমন আছেন? আদৌ বেঁচে আছেন কিনা জানি না। বাবার কথা মনে করলেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
আম্মাকে নিয়ে গেলেন শাকুর মামা। আম্মার সঙ্গে মান্নত আপাও গেলেন। মান্নত আপা কান্নাকাটি দেখে মামা আপাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করে বললেন, আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না মা। তুমি চিন্তা কর না। কালই বুবুকে আমি বড় ডাক্তার দেখাব। ডাক্তারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। রাতটা পার হতে দাও। আম্মার যে অবস্থা রাত পার হয় নাকি ধনশন। ঢাকা শহরের সমস্ত অন্ধকার যেন আপার চোখেমুখে জড়ো হয়েছে। অন্ধকার মুখের আকাশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু পড়ছে বেদনার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। কান্নাকাটির মধ্য দিয়ে রাত পার হয়ে গেল। রাতে মনে হয় সব অসুখই বেশি হয়। ফজরের আজান ভেসে উঠার সাথে সাথে আম্মা একটু আরাম হলেন। তবে আম্মার আগের চেহারা ঠিক নেই। চেহারা যেন ভেঙে ভেঙে গেছে। তবে কথাবার্তা স্পষ্ট, জড়তা নেই। হুশজ্ঞান একদম ঠিক আছে। আপাকে বললেন মামাকে ডাকতে। আম্মা মামার সাথে একান্তে কথা বলতে চান। মামার চোখমুখও অন্ধকার। সেখানে দুঃখ লেগে আছে। মামার তৎপরতায় সে-ই দুঃখ সহজে চোখে পড়ছে না। ভাই, হামার শরীলের অবস্থা ভালো লয়, দুই চোখ বুজার আগে মেয়েডাক বিয়ে দিয়ে যাবার পারলে শান্তি পানুহিনি[পাইতাম]। নাহলে মরেও হামি শান্তি পামু না। তুমি এডা ভালো ছেলে দেখে বিয়ের ব্যবস্থা কর। মামা বুঝতে পারেন যে আম্মার অবস্থা ভালো না তবু আম্মাকে অভয় দিয়ে বলেন, বুবু তোমার কিছু হবে না। তুমি ওসব চিন্তা কর না। আমরা একটুপরেই ডাক্তারের কাছে যাব। ডাক্তার দেখার পর বললেন, অনেক লেট হয়ে গেছে। এই রুগির অবস্থা যখন-তখন। ডাক্তার মামার বন্ধু মানুষ। সবকিছু খুলেই বললেন, এতদিন যে বেঁচে ছিলেন সেটাই আশ্চর্যজনক। এক যুগের বেশি সময় ধরে তিনি এই রোগ পুষছেন। মামার তো মুখচোপা বাঁকা হওয়ার জোগাড়।  একি করলাম আমি! কুলসুমের খবর নেওয়া উচিত ছিল আমার! মামা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে কু্ঁজো হয়ে বসে পড়েন।
বাসায় ফেরার পর নিজের ছেলেকে এক নির্জন জায়গায় ডেকে নিলেন। শুভ ভাই গেল বছরে লন্ডন থেকে লেখাপড়া শেষ করে ফিরেছে। দেশে ফিরে মামার অফিসে জয়েন করেছে। খুব ভদ্রগোছের ছেলে। বাবা তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে, মামা ছেলের হাত ধরে বললেন, তুমিই  আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে পার। মামাকে অনেক কাতর দেখাচ্ছে। মামাকে এভাবে কখনও দেখেননি। নদীভাঙা গাছের ডালের মতো অসহায় লাগছে। বাবা আপনি এভাবে বলছেন কেন? আপনি আমার পিতা, আমাকে আদেশ করবেন। বলেন আমাকে কী করতে হবে?  না বাবা, আগে বল তুমি আমার কথা রাখবে, ফেলে দেবে না। শাকুর মামার ভিতর বিবেক দংশন হচ্ছে। যদি পারতেন নিজের ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে যেতেন। মান্নতকে তোমার বিয়ে করতে হবে, মামা বললেন। শুভ ভাই চমকে উঠলেন, মান্নত! তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে আবার কে? তার চিড়ধরা ফাটা কণ্ঠ, যার নামটা পর্যন্ত আগে শুনিনি তাকে বিয়ে করতে বলছেন? তা ছাড়া বাবা আমি একজনকে... ছেলেকে কথা শেষ করতে দিলেন না মামা। বললেন, তোমার কুলসুম ফুপুর মেয়ে যে এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। তুমি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছ। আর মেয়েটা অনেক ভালো, আমি তোমার বাবা, আমি তোমার খারাপ চাইব না। মান্নত অনেক লক্ষ্মী মেয়ে। শুভ ভাই নরম হয়ে আসে। মাথাটা নিচু করে হাতের আঙুল ফোটাতে চেষ্টা করে। বাবা! শুভ ভাই কিছু বলার জন্য মুখ খোলেন কিন্তু শাকুর মামা থামিয়ে দেন। আর কোনও কথা নয়, আজ রাতেই শুভ কাজটা সেরে ফেলব। তোমার ফুপুর অবস্থা ভালো না। তুমি প্রস্তুতি নাও। বাপের কথা শুনে তার লম্বা নাকের নিচে ঠোঁট বন্ধ হয়ে গেল। ভাই উঠে গিয়ে ফের বসে পড়লেন, আম্মা শুনলে... ঠোঁটজোড়ার বাঁধন ঢিলে করে এরচেয়ে বেশি বলতে পারলেন না। মামা বললেন, তোমার মায়ের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। বাপের বাক্যে এভাবে বন্দি হয়ে ভাই নিজের কামরায় চলে গেলেন। মামা হাঁফ ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন।
নিশির সঙ্গে ভাইয়ের সম্পর্ক বেশি দিনের নয়। খুব একটা জানাশোনা নেই দুজনার মধ্যে। সম্পর্ক বেশিদিনের না হলেও ভাই মনেপ্রাণে বুঁদ হয়ে গেছে। মামি নিজেই এই সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। নিজের বোনের মেয়েকে বউ করে নিয়ে আসার ইচ্ছে তার। এই ইচ্ছের পিছনে রয়েছে তার দুরভিসন্ধি।
মামির কানে যাওয়া মাত্র তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। আগুনের মতো লাল হয়ে ঝড়ের মতো বলেন, আমি এটা কখনই হতে দেব না। তার চিল্লাচিল্লি শুনে মামা ঘর থেকে দ্রুত পায়ে বের হয়ে আসেন। মামাকে আসতে দেখে শুভ ভাই হালকার ওপর কাশি দিয়ে জায়গা প্রস্থান করলেন। শুভ ভাইয়ের দোটানা অবস্থা।  একদিনে মা আরেকদিকে বাবা। যদিও মায়ের তরফ নিতে তার মন আকুলিবিকুলি করছে। একবার তার একটা ভাবনা মনে উঁকি দিল, তার মন খচ করে উঠল। বাবা কি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাকে বলি দিচ্ছে? বাবা তো এরকম মানুষ না! ভাই সংশয়ে ভিমড়ি খেয়ে পড়েন। যখন আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি তখন তাকেই বিয়ে করা আমার জন্য আনন্দের। গলায় ঢকঢক করে জল ঢালেন। গলা ভিজলেও মনটা তার কাট হয়ে আছে। জল খেতে খেতে মা-বাবার বাকবিতণ্ডা শুনতে পান। আমার ছেলের জীবন আমি নষ্ট হতে দেব না। তাও আবার দুই টাকার মেয়ের জন্য যার কোনও যোগ্যতা নেই। একটা ভিখারি পরিবারের মেয়েকে এই ঘরে নিয়ে আসতে পারব না। মামা সিংহের মতো হুংকার দিয়ে উঠলেন, খবরদার! তুমি যদি আরেকটা বাজে কথা বলছ। মামার চপটে মামি থরথর করে কেঁপে ওঠে। এত শান্ত মেজাজের মানুষ কিভাবে এতটা রাগান্বিত হতে পারে? মামি তব্দা খেয়ে যান। এত সহজে মামি হাল ছেড়ে দেওয়ার বান্দা না। মামি বলে, আমার সম্মান আমি লুট হতে দেব না। ছেলে শুধু তোমার একার না, আমারও ছেলে। আমারও অধিকার আছে। মামি দাঁত কিড়মিড় করে কথাগুলি বলেন। মামির এমন উগ্র চেহারা দেখে মামা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। কষে মামির গালে একটা চড় বসিয়ে দেন। মামি হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে ধরেন। মামির বাহু চেপে ধরে বলেন, তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি কর তোমাকে তালাক দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেব। এই বাড়ি-গাড়ি, ধন-দৌলত সমস্ত  আমার। তোমার কিসের তাত্তি? মানলে মানি না মানলে দুই পায়ে ছানি। মামি একদম বেলুনেরমতো চুপসে গেলেন।  তালাকের কথা শুনে ঠান্ডা হয়ে গেছেন। যেন তার রাগ-ক্ষোভ বলে শরীরে কিছু নেই।
মায়ের এমন অপমান একজন ছেলের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। শুভ ভাই পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঢোরা সাপের মতো ফুঁসছেন। বাপের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, বাবা! আপনার বোনের মেয়েকে আমি বিয়ে করব না। জীবন আমার সিদ্ধান্ত আমার। আমার যাকে পছন্দ তাকে বিয়ে করব। কড়া চাহনিতে বাপের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাকে দেখতে খুব ভয়ংকর লাগছে। আহত বাঘের মতো চাহনি তার। মামার তো পোড়া আলুর মতো অবস্থা। সন্তান যখন বাপের সঙ্গে এভাবে মুখ করে তখন বাপের নাক কেটে যায়। মামা অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। কিছু একটা বলার জন্য মুখ হাঁ  করলেন কিন্তু বলতে পারলেন না। তার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ধপাস করে৷ হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল মামার। বড় একটা ধাক্কা পেয়ে গেছেন মামা। সাথে সাথে মামাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কিসের বিয়ে নিয়ে বাহাজ! মামার জীবন নিয়ে টানাটানি উঠে গেল। শুভ ভাইয়ের চোখ দিয়ে বন্যা হয়ে যাচ্ছে। মান্নত আপাও কান্নাকাটি করছেন। মামা! আপনার একি হয়ে গেল? আম্মা এসবের কিছুই জানেন না। তাকে কিছুই জানানো হল না। মামার হুঁশজ্ঞান ফিরল। মামাকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। মামি খুব সিরিয়াস মামাকে নিয়ে। মামার পাশ থেকে নড়ছেন না। শুভ ভাই গায়ে হাওয়া লাগাতে বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তার মনের ওপর একটা চাপ পড়েছে। বাসা থেকে বের হওয়ার পর মনে হল নিশির কাছে যেতে পারলে তার একটু ভালো লাগবে। এরমধ্যে মামা ডেকে পাঠালেন। ঘরের মধ্যে তার মা-বাবা দুজনই। ভাই সালাম দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। মামা ভেবেছিলেন যে এবার তার কথায় অমত হবে না, কিন্তু শুভ ভাই মান্নত আপুকে বিয়ে করতে রাজি হল না। মামা একটুও জোরাজুরি করলেন না। আচ্ছা ঠিক আছে, যাও। মামার চেহারায় কোনও ভাবের ছাপ পড়ল না। শুধু মামিকে বললেন এক গ্লাস পানি দিতে। মামার গলা শুকিয়ে আসছে বারবার।
মামার হাতে ছেলের অভাব নেই। শুভ ভাইয়ের চেয়ে ঢের যোগ্য ছেলে আছে। মান্নত আপুর মতো এত লক্ষ্মী মেয়েকে নিজের ঘর থাকতে অন্যের ঘরে পাঠাতে আফসোস হচ্ছিল।  মামা তা-ই নিজের ছেলের বউ করে ঘরে রাখতে চেয়েছিলেন। এভাবেও যদি মনের কিছুটা আক্ষেপ কমত!
ফোনটা হাতে নিয়ে নিশি আপার নাম্বার ডায়াল করতে গিয়ে করলেন না। সোজা হাঁটা ধরলেন তাদের বাসার দিকে। কয়েকটা দরজা পার হয়ে নিশি আপার ঘরে যেতে হয়। নিশি আপার ঘরের দরজা ভিতর থেকে লক করা। ভিতর থেকে লক করা থাকলে কারো খোলার সাধ্য নেই। ভাইয়ের কপালে ভাঁজ পড়ল। এভাবে তো নিশি কখনও লক করে রাখে না। ডাল মে কুছ কালা হ্যা। বাইকের চাবি দিয়ে জোরাজুরি করতেই খুলে গেল। ভিতরে গিয়ে  নিশি আপাকে তার বন্ধুর সাথে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখতে পেলেন। ভাইয়ের চক্ষুচড়ক গাছ। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নিশি আপা গায়ের কাপড় ঠিক করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সমস্যা হল আপা তার গায়ের কাপড় খুঁজে পাচ্ছেন না। শুভ ভাই ঘর থেকে হনহন করে বের হয়ে আসলেন। নিচে নেমে বারান্দায় পেতে রাখা সোফায় মাথা চেপে ধরে বসে পড়লেন। মাথায় হাতের স্পর্শ পেতেই ভাই চোখ তুলে ওপরে তাকান। বাবা, তুমি এখানে বসে আছ কেন? ওপরে যাও। আন্টির কথা শুনে এমন ভাবে চোখ কটমট করে তাকালেন যে তাকে কচমচ করে খেয়ে ফেলবে। আন্টির সাথে কোনও বাতচিত না করে ঝড়ের বেগে বাসা থেকে বের হয়ে পড়লেন। তার মাথাটা টলমল করছে। পায়ের ভারসাম্য ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে না। ভাই রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বসে পড়ে। তার সবকিছু আউলিয়ে গেছে। যে মেয়েটার জন্য  জন্মদাতা বাপের অবাধ্য হলেন, সে-ই মেয়েটা তার সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করল?  নান্নু একটা বেনসন ছাড়, শুভ ভাইয়ের মেজাজ খিচড়ে যাচ্ছে। নান্নু তো রীতিমতো টাস্কি খেয়ে গেছে। শুভ ভাই সিগারেট খেতে চায়! সে ভাইয়ের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, শুভ ভাই আপনার কি হছে? আপনাক  ইনকে[ আপনাকে এমন] লাগিচ্ছে ক্যা? যা বলছি তা-ই কর, মাল ছাড়। চপটের সাথে ভাই বললেন। নান্নু ঝাড়ি খেয়ে সুরসুর করে একটা সিগারেট বের করে দেয়। সিগারেট টানা দেখলে যে-কেউ সিগারেট খোর ভাব্বে, রেগুলার স্মোকার ভেবে বসে থাকবে অথচ ভাই কখনও সিগারেট হাতে নেয়নি। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে দেখতে পান তার জিগরি দোস্ত পরান ধেয়ে আসছে। তাকে বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এখানে এসে ভাইয়ের নাগাল পেয়েছেন। শুভ ভাইয়ের কাছে ফোন নেই। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফোন বিছানার ওপর ভুলে রেখে এসেছেন।  পরানদা বলেন, তুই এখানে কি করিস? চল বাসায় চল। তিনি এমন ভান ধরে কথা বলেন যে হঠাৎই তার সাথে দেখা। এখনও তার বুকের ধুকপুক থামেনি।  ভাই বলেন, তুই ইনকে করে হাঁপাচ্ছু ক্যা? আঞ্চলিক ভাষা তার মুখে খাপছাড়া লাগছে। পরানদা তার মুখের ভাষা ও মুখের খাবার দেখে বিস্মিত হচ্ছেন কিন্তু এসব নিয়ে এখন তার কথা বলার সময় নেই। পরানদা বলেন, তুই বাসায় চল। ভাইয়ের রাগ চড়ে যায়। বন্ধুর গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলেন, কি শুরু করছু? এত বাসা বাসা করছু ক্যা? বাসাত যায়ে হামি কি করমু? বাসাত যাওয়ার মুখ হামার নাই। শেষ বাক্যের দেয়াল ঘেঁষে  অভিমান উৎপাত করে খাড়া হয়। চড় খেয়ে পরান দার রাগ হয় কিন্তু ভাই রাগ হজম করে। পরান দার মুখের ভিতর তুই বাসায় চল বাক্যটা ছুটোছুটি করে। বাক্যটা ঢুকি চেপে, থুতুর সাথে গিলে খায়। ভাইয়ের রাগ পড়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। ভাই সমানে সিগারেট টানে। এক সময় সে সিগারেটের ওপর বিরক্ত হয়ে হাতের সিগারেট মাটিতে ফেলে দিয়ে পায়ের তলা পিষতে থাকে। ভাই ভেবেছিলেন যে সিগারেট খেলে এই যন্ত্রণা দূর হবে। সমস্ত রাগ তা-ই সিগারেটের ওপর ঝাড়েন। তার এই থমথমে চেহারা দেখে পরানদা কি করবে ভেবে পায় না। তবু বেমক্কা ভয়েভয়ে কাচুমাচু করে তাকে বলতে হয়, চল বাসায় যাই, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ভাইয়ের মেজাজ আরও বিগড়ে যায়। তার মুখের ভাষা খারাপ হয়ে যায়। তুই একটা শাওই, অত বাসা বাসা লাগাছু ক্যা? তুই কিছু জানিসনে, একটা খারাপ মাগির জন্য হামি আব্বার অবাধ্য হছি, হামার জন্য আব্বা মরবের ধরছিল! বলতে বলতে ভাই কেঁদে ফেলেন। পরানদা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ঝোপ বুঝে কোপ মেরে দিলেন, এইজন্যই তো কচ্চি বাসায় চল, আংকেলকে হাতে-পায়ে ধরে মাফ চাসনি! শুভ ভাই এইবার বশ মানেন।
তিনটে গলির মাথায় শুভ ভাইদের ফ্লাট বাসা। রিলেক্স হ বেটা, এত দৌড়েচ্ছু ক্যা? পরান ভাই জোরে পা ফেলছিল। তাড়াহুড়ো করা দেখে শুভ ভাই বলেন, এনা থাম তো! আব্বাক যায়ে[গিয়ে] হামি কি কোমু[বলব] আগে গুছে লিই। পরান ভাই তাকে বাসায় নেওয়ার তালে আছেন। দাদা বলেন, বাসাত যায়ে দুইজনে ঠিক করমুনি, এখানে দেকুচ্চু না গাড়ি-ঘোড়ার প্যাঁ পুঁ। তারা দুজন হাঁটতে থাকেন। পরানদা অনেকটা ঠেলে ভাইকে বাসার দিকে নিয়ে যান। বাসার সামনে অনেক মানুষের জটলা। গায়ে পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি পরা। মামার অফিস থেকে অনেক লোকজন এসেছে। শুভ ভাইয়ের চোখে খোঁচা লাগে। বাবার অফিসের লোকজন ক্যা এটি[এখানে]? পরানদাকে পুছ করেন। পরানদার চোখ টলমল করছে। মুখটা লুকিয়ে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করছেন। কি হল কথা কস না ক্যা বে? দাদা চুপ করে হাঁটতে থাকেন। কোনও উত্তর দেন না। গেটের ভিতর যেতেই শুভ ভাই মেয়ে মানুষের কান্নাকাটির গলা শুনতে পান। গলাটা চিনতে ভুল হয় না তার। ফুপু তাহলে চলে গেলেন। একটা দুঃখের দম ছাড়লেন নিজের ঠোঁটমুখ কামড়ে। দুনিয়া ছাড়ার আগে নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারতেন, একটু ভারমুক্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ছাড়তে পারতেন। আমি যদি দুই নম্বর মেয়েটার পাল্লায় না পড়তাম! এসব ভেবেই বুক ভারি করলেন ভাই। বাপের সামনে এই মুখ কিভাবে দেখাবে? এই ভেবে তার পা ওঠে না, মাটির সাথে আটার মতো লেগে থাকে। ভিতরে ভিতরে কাঁচের মতো ভেঙেচূড়ে যান। মুরাদার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। শাদা কাফনে মুখটা হালকা করে মোড়ানো। মুরদাকে দেখার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শুভ ভাই আসার আগেই সবাই শেষ দেখা দেখে নিয়েছে। ফুপুকে শেষ দেখা দেখার জন্য মুখটা সামনে বাড়াতেই তার দিনদুনিয়া আন্ধার হয়ে যায়। বাবা বলে হামলে ওঠেন। ও বাবা বলে যখন ডাক ছাড়লেন, তার ডাকে উপস্থিত সবার চোখে পানি ছলকে ওঠে।  ভাই হামলে হামলে কেঁদে ওঠেন, তাকে কেউ থামাতে পারে না।
দুই মুরদার জানাজা এক সাথে হবে। তারপর দুই মুরদাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। শুভ ভাই বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরেই মামা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মামার মৃত্যুর কথা জানতে পেরে আম্মাও দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে মান্নত আপার সেকি গগনবিদারী কান্না। তার কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।  মামা যখন বুকের ব্যথা নিয়ে বুক চেপে ধরে পড়ে যাচ্ছিলেন, মামি তখন চেয়ে চেয়ে দেখেছেন, কাছে আসেননি। মামা খুব চটে গিয়েছিলেন, মামির ওপর রাগ হয়েছিল খুব। আমার ছেলে তো এরকম ছিল না, তুমি নিশ্চয় কানপড়া দিয়েছ, মামিকে সাটাসাটি করছিলেন, মা হয়ে তুমি সন্তানকে জন্মদাতা পিতার বিপক্ষে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ। দিয়েছি তো কি হয়েছে? তুমি কি করবে? মাই ফুট! মামার তখনই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি মাটিতে আছড়ে লুটিয়ে পড়েন। তারা দুজন যখন তর্কাতর্কি করছিলেন, আম্মার ঘর থেকে আপা বের হয়ে পড়েছিলেন। মামা ঠিক আপার চোখের সামনে ধপাস করে পড়ে যান। মামা আপনার কি হল? এই বলতে বলতে আপা কেঁদে ফেলেন। মামি তখন গোমরা মুখে দাঁড়িয়েই থাকেন। আপার কান্নার আওয়াজ শুনে আম্মা ঘর থেকে ছুটে আসেন। মামার নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে আম্মাও ফিট হয়ে পড়ে যান আর জ্ঞান ফেরে না।
কয়েকদিন পর। গ্রামের বাড়ি থেকে শুভ ভাই ঢাকায় ফেরেন। সঙ্গে মান্নত  আপাকে নিয়ে। আপা তখন তার অর্ধাঙ্গিনী৷ বাবার ইচ্ছে পূরণ করে নিজেকে হালকা করেছেন। মামিও বাগড়া দেওয়ার সাহস করেননি। নিজের বোনের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেওয়ার খাহেশ মিটাতে না পারার ক্ষোভ তার আচার-আচরণে চোখে পড়ে না। মামি খুব সাবলীল। আপার সাথে এক গলা পিরিত।  বাসায় দুজন গলা ধরাধরি করে থাকেন। দেখে মনে হয় দুজন স্কুলবেলার সখি। মাঝেমধ্যেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান শুভ ভাই। পরানদাও হঠাৎমটাৎ সাথে থাকেন। পরানদার সাথে আপারও একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছে।
ভাই না থাকলেও পরানদা বাসায় আসেন, আড্ডা দেন। আন্টির সঙ্গে দাদার সম্পর্ক আরও মজবুত। তাদের দেখলে মনে হয় পরনদার সঙ্গে ভাইয়ের বন্ধুত্ব না, আন্টির সঙ্গে বন্ধুত্ব। কখনও ভাইয়ের ঘরে আড্ডায় বসেন আবার কখনও আন্টির ঘরে আড্ডায় বসেন।
সেদিন আপার ঘরেই আড্ডা বসেছিল। শুভ ভাই তখনও আসেননি। তবে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আকাশের মাথায় চাঁদ ঘনঘন জায়গা বদল করছে। আন্টির ফোনে মেসেজ আসার শব্দ টুন করে উঠল। অমনি আন্টি ঘরের বাইরে চলে গেলেন। মূল গেটের দরজা হাট করে খোলাই ছিল। ভাই যে চলে আসছেন তা বাসার একটা পোকাও টের পাননি। ঘরের দরজাটা কিঞ্চিৎ ফাঁকা। ভাইয়ের হাঁটার শব্দ ঘর থেকে পাওয়া গেল। পরানদা দরজার সাথে লাগানো সোফায় বসেছিলেন। ধাম করে দাঁড়িয়ে গেলেন।  দেখো মান্নত এভাবে আর কতদিন? একদিন হয়তো ধরা পড়ে যাব। এরচেয়ে ভালো চল আমরা পালিয়ে যাই। পরান দা এই বলে আপার বুকের ওড়নাটা সরিয়ে দিলেন। আপা কিছু বলার আগেই শুভ ভাই ঘরে প্রবেশ করলেন থমথমে মুখে। তারপরই ঢুকলেন আন্টি। তুই তো বাবা আমাকে বিশ্বাস করিস না, আমার কথা কানেই তুলিস না। আজ তো নিজের কানে শুনলি? এই চরিত্রহীন মেয়েকে আমি বাসায় রাখতে চাই না। এখনই এই মেয়েকে তুই বাসা থেকে বের করে দে। আন্টি বলতেই থাকলেন গজগজ করে, এই মেয়ে বাসায় থাকলে আমি থাকব না বাবা বলে দিচ্ছি। মূহুর্তের মধ্যে সবাইকে অচেনা লাগছে। আপা ঠিক ঠাহর পাচ্ছেন না। আম্মা এসব কি বলছেন আপনি? আমি কিছু করিনি। আন্টি ঠাস করে আম্মার গালে চড় বসিয়ে দেন। চুপ কর তুমি, তোমার কথা আমি শুনতে চাই না। এর মা-ই বাপকে নিয়ে সংসার করেনি, সে-ই মায়ের সন্তান আর কত ভালো হবে? পরপুরুষের সাথে নষ্টিফষ্টি না করলে ভালো লাগে না তাদের। আপা কেঁদে ওঠেন, ভাইয়ের কাছে যান। ভাই মুখ সরিয়ে নেন। পরান দা আন্টি বলে ঠোঁটের গিট্টু খোলেন। আন্টি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, বাবা তোমার আর কোনও কথা শুনতে চাই না। তোমার সদা তুমি নিয়ে যাও। পরান দা ঘর থেকে বের হয়ে চলে যান। আন্টি আপাকে গেটের বাইরে নিয়ে এসে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। দারোগা ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেন। বাইরে থোরা আলো থোরা অন্ধকার। আপা গেটের শরীর ধরে ঝাকাতে থাকেন, শুভ বলে চিল্লাতে থাকেন, আম্মা বলে ডাকতে থাকেন। আলো ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিকে অন্ধকারের হুলুস্থুল দাপাদাপি। আপা কুয়াশার শাদা রাতে ময়লা কাপড়ের পুটলির মতো দেয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকলেন।
কিছু বলবে? কমলদাসকে কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে ভাই বললেন। তার চেহারা  মলিন দেখাচ্ছে। মনে হয় রাতে ঘুম হয়নি। চোখের নাটায় লাল বাতি জ্বলে আছে। ম্যাডাম তো গেটের সামনে বসে আছেন, কমলদাস ভাঙা ভাঙা ভাষায় কথা বলে। কি করতে হবে সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? শুভ ভাই চপট মারেন, তোমাকে তাহলে কেন রাখা হয়েছে? কমলদাস সুরসুর করে বের হয়ে আসে। তার কুতকুতে চোখের নিচে আনুগত্য ঠিকরে পড়ে চকচক করে।
অফিসে বসে পত্রিকা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতেই শুভ ভাই চমকে ওঠে। খুন! ভাই ফট করে লাফিয়ে ওঠে চেয়ার থেকে। তার বুকে চিনচিন করে ব্যথা হচ্ছে। বাসায় ফেরার পথে পরানদা খুন হয়েছে। তাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। এক আঘাতেই কুপোকাত। স্পট ডেড হয়েছে পরানদার। পুলিশের নাকের ডগায় খুনটা হয়েছে। অল্পের জন্য হাত ছাড়া হয়েছে খুনি। পুলিশ হন্য হয়ে তালাশ করছে। পুলিশ বলছে, খুনি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছে, চলে গেলেও আমাদের নেটওয়ার্কের বাইরে যেতে পারেনি। পুলিশ নকশি নামে একটা নারী  সংগঠনকে খুঁজছে যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরানকে কিসক[ কেন ] মেয়ে মানুষ খুন করবি? আবার ভাই কি যেন ভেবে বিড়বিড় করে বলেন, শালা তো ভালোই মেনকা শয়তান! মান্নতকে ফুসলেফাসলে প্রেমে ফেলিছে।না জানি কত মেয়ের সাথে ইনকে করিছে! তারাই বেন শালাক মেরে ফেলিছে। চুলের গুছির ভিতর হাত চালিয়ে দিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস ছাড়েন। ভাইয়ের হাত-পা চিনমিন করতে থাকে। একটা ভয় তার মধ্যে ঢুকে গেছে। বেল চেপে পিএসকে ডেকে নিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে বললেন। আরও বললেন যে অতিরিক্ত গার্ড অফিসের সামনে মোতায়েন করতে। ভাই এই নিয়ে চিন্তিত যে নিয়মের বাইরে যেন কিছু না ঘটে। তবে তাকে পুলিশের বক্তব্য কিছুটা স্বস্তিও দিয়েছে। যেহেতু নকশি মেয়েদের সংগঠন, তার দিকে তীর আসার সুযোগ কম। তার এই হালকা স্বস্তিতে চিড় ধরতে সময় লাগে না। অফিসে পুলিশ আসার কথা শুনে তার জিউ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ভাই তো পুরো ঘাবড়ে গিয়েছেন। ঢকঢক করে পানি খেলেন। আপনি তো পরানের ক্লোজ  ফ্রেন্ড? আপনার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে খুন হয়েছে। আপনি তার খুনের ব্যাপারে কিছু জানেন? পুলিশের চোখ চোরের মতো ছালুবালু করে এদিক-সেদিক। না, আমি কিছু জানি না, ভাই গড়গড় করে বলেন। পুলিশ মুখ চটকায় আর তেলচা চোরের মতো হাত কচলায়। বন্ধু হয়ে কিছু জানি না বললে তো হবে না! পুলিশের থেবড়ো নাকের ঝুল বারান্দায় কথাটা কাঁচা গুয়ের মতো লেগেই থাকে যেন। গুয়ের সাথে হলুদ হয়ে থাকে তার শয়তানি হাসি। সে চেয়ার থেকে উঠে যাওয়ার আগে বলে, আমি আবার আসব৷ চায়ের কাপে বিস্কুটটা ডুবিয়ে দিয়ে সে চলে যায়। সে চায়ের সাথে বিস্কুট না, অন্যকিছু খেতে চায়। পুলিশের জিবে কুত্তার জিবের মতো হেলফেল করে।
শুভ ভাই অফিস ছেড়ে বাসায় চলে আসে। তাকে দেখেই আন্টি বুঝতে পারেন যে কিছু একটা ঘাবলা হয়েছে। বাবা তোমার কি হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন? আন্টির অস্থিরতার গলা, কণ্ঠে মাতৃত্বের মায়া ফুটে উঠেছে ষোলো আনা। আন্টি পারেনও বটে। ভাইয়ের কথা শুনে আন্টি এমন ভান করলেন যেন আকাশ থেকে পড়লেন। এসব হল কিভাবে? ছেলেটা কত ভালো! যতক্ষণ এ বাসায় থাকত সবাইকে আনন্দে মেতে রাখত! এত ছলেরও শত্রু থাকতে পারে? সে-শত্রু নিশ্চয় জালেম।  তার শীতল গলার পিঠে একটু কড়া রোদ পড়ল, তুমি চিন্তা কর না বাবা, আমি পুলিশকে দেখছি। ম্যাডাম, গাড়ি রেডি, কমলদাস এসে বলল। আন্টি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। ফোনে কাউকে যেন শাসিয়ে যাচ্ছেন। রাগের কারণে তার চোয়ালের ওপর থলথলে মাংসের পিণ্ড লাল হয়ে গেছে। সে-ই দিন থেকেই আচমকা পুলিশের তৎপরতা বন্ধ হয়ে গেল।
মান্নত আপা ভেবেছিলেন যে তিনি সবকিছু ঠিক করে ফেলতে পারবেন কিন্তু তিনি পারলেন না। আন্টির কড়া ডিফেন্স ভেঙে শুভ ভাইয়ের কাছে পৌঁছতে পারলেন না। মিরপুরে বান্ধবীর মেসে উঠেছেন মান্নত আপা। ব্রুনা আপাও বগুড়ার মেয়ে। চেহারায় যতটা কালো মনের দিক দিয়ে ততটাই ভালো। তারা দুজনই একই সাথে বগুড়ার মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে পড়তেন। মেডিকেল এডমিশন নেওয়ার জন্য আপাকে অনেক জোরাজোরি করেছেন কিন্তু আপা রাজি হয়নি কারণ আম্মার অমত ছিল। আপাকে নিয়ে আম্মা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতেন। আম্মা বলতেন, গরিব মানুষের মান-সম্মানের ভয় বেশি। এ সমাজে ছেলে মানুষের বদনাম হয় না। যত বদনাম মেয়ে-মানুষের হয়। হামরা গরিব, গরিবের মান-সম্মানই বড় সম্পদ। কলেজ পেরুতেই আপাকে নাজেহাল হতে হয়েছে। রোজ রোজ উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তেন। আম্মা রেগে গিয়ে বলতেন, তোক কলেজে পড়বের দিয়ে হামি ভুল করিছি। আপাকে পেয়ে ব্রুনা আপা বেজায় খুশি। আপাকে মন মরা হয়ে থাকতে দেখলেই খুব করে বকা দেন। ব্রুনা আপা বলেন, তুই এইবার এডমিশন দিবি, হামার বিশ্বাস তুই চান্স পাবি। তখন দেখপি শুভর মতো হাজারটে ছেলে তোর পিছোনোত[পিছনে] ঘুরঘুর করিচ্চে। আপার তো শুধু শুভ ভাই চাই। তাকে মন দিয়ে বসে আছে। বাঙালি মেয়ের মন এমনিতেই স্বামীর হয়ে যায়। জল-হাওয়া কিছু লাগে না। ফসল বাম্পার। আপার মন তো ভাইয়ের জন্য কাঁদে কিন্তু ভাই তো আপার নাম পর্যন্ত সহ্য করতে পারেন না। মান্নত আপার কথা বলতে গিয়ে বাসা থেকে ছাটাই করে দিয়েছেন কলমদাসকে। মায়ের প্রতিকূলে কোনও কথা শুনতে সে নারাজ। একাধিকবার আপা ভাইয়ের অফিসে গেলেন কিন্তু ভাই কুকুরের মতো দূরদূর করে তাড়িয়ে দিলেন। শেষবার তো এমনভাবে ধাক্কা দিলেন যে আপার পেটের বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেল। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে অবাক চোখে চেয়ে থাকলেন। আকাশের তারাদের সঙ্গে তার কি যে কথা হল! আপা বদলে গেলেন। আপা যেন নতুন জীবনে নাম লেখালেন। আপা পড়ার টেবিলে বসেন যেভাবে গ্রামের রাস্তার ধারে ভাঙা বাড়ির খিড়কি বন্ধ করে পড়তে বসতেন। যেভাবে পলের ঠিপির ওপর পা জড়ো করে পড়তে বসতেন। যেভাবে পড়তে পড়তে ধানে লাগা মুরগি খেদাতেন। যেভাবে পড়তে পড়তে পেয়ারা গাছের ডালে পাখি বসা দেখতেন। ব্রুনা আপা মাঝেমধ্যে বলেন, ইনকে করলে তুই পাগলি হয়ে যাবি, তোর অত পড়া লাগবিল্লায়, তোর যে মাথা এমনি তুই চান্স পাবি ছুরি[মেয়ে]! আপা থামে না, আপার যেন মনে জেদ চেপে বসেছে। তাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
পাপ বাপকেও খাতির করে না। ছয় মাসের মাথায় পুলিশ থোলের বিড়াল ধরতে পারল। ভাই তার ভুল বুঝতে পারলেন যখন তার সামনে দিয়ে নিজের মাকে চোরের মতো হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে যেতে দেখলেন। প্রথমে ভালোই চোটপাট করলেন কিন্তু পরে যখন পুলিশ কাগজপত্র দেখালেন, একদম ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলেন।
শুভ ভাইয়ের পাগল হওয়ার মতো অবস্থা। সব সময় মেজাজ খিটমিটে থাকে। উকিলটুকিল ধরে কোনও কাজ হচ্ছে না। আসলে প্রথম থেকেই পুলিশের কাছে সব নথিপত্র, আলামত ছিল, শুধু রাজনীতির চাপে চুপ ছিল। মহিলা কমিটির সভাপতি পদচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর থেকে কিয়ামতের আজাব শুরু হয়ে যায় আন্টির সাথে। সব পাপ বের হয়ে আসে। ভাইয়ের সারা রাত ঘুম হয় না। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। তার এত টাকাপয়সা কোনও কাজে আসছে না। টাকা দিয়ে নাকি বাঘের চোখ কেনা যায়। ভাই মাত্র মায়ের জামিন করাতে পারছেন না।
আবার ভাইয়ের মনে আপার ভালোবাসা খুদলে উঠেছে। মায়ের একটা হিল্লে করতে পারলে আপার তালাশে বের হবেন ভাবছেন। লোকজন লাগিয়ে দিয়েছেন চারদিকে। কোথাও থেকে হদিস মিলছে না আপার। আন্টির জামিন হয় না, আপারও দেখা মেলে না। এরমধ্যে একবার গ্রামে এসে ঘুরে গেলেন। কোথাও থেকে আশার আলো পেলেন না। দিনকে দিন হতাশার মধ্যে ডুবিয়ে যেতে লাগলেন।  বুকের ভিতর অতীতজীবন চাপা দিয়ে আপা জীবনের নতুন মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। আপা মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলেন। শুভ ভাই নিজেকেও বাঁচাতে পারলেন না, নিজের মাকেও বাঁচাতে পারলেন না। আন্টির ফাঁসির রায় হয়ে গেছে। শুভ ভাই আন্টির সাথে শেষ দেখা করতে গেলেন।  অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে ভাই। আন্টি কেঁদে কেঁদে বলছেন, বাবা আমি মরতে চাই না, আমার ভয় লাগতেছে। সারা রাত ভাই কান্নাকাটি করেছেন। চোখমুখ ফুলে ডোল হয়ে গেছে। আম্মা, তুমি কেন এসব করতে গেলে? মান্নতকে তোমার এতই অপছন্দ!  আমাকে কেন বললে না? আমি তাকে তালাক দিয়ে দিতাম। তুমি আমার মা, তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারতাম। আন্টি শুধু বলেন, বাবা আমার ভয় লাগতেছে, আমি মরতে চাই না বাবা। মান্নতের কাছে আমাকে নিয়ে যাও, মান্নত মায়ের কাছে ক্ষমা না চেয়ে আমি মরতে চাই না বাবা। শুভ বাবা, আমার ভীষণ ভয় লাগতেছে। আমাকে একা ছেড়ে যেও না, তুমিও আমার সাথে চল বাবা। আমি একা যেতে পারব না। বাবা আমার খুব ভয় লাগতেছে।  শুভ ভাই আন্টিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমিও তোমার সঙ্গে যেতে চাই আম্মা! আমি এই পৃথিবীতে একা থাকতে চাই না।  আমাকে সঙ্গে নিয়ে চল আম্মা। মা-ছেলের কান্না দেখে দায়িত্বরত পুলিশ নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না, কেঁদে ফেলে। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, আপনাদের সময় শেষ হয়ে গেছে।