banner

We love to create unique, successful templates for your websites

Countdown Timer Expired

Days
Hours
Minutes
Seconds
নিভৃতচারী

ফারাহ আজাদ দোলন

  কোনো এক রমজান মাসের শীত বিকেল। আসরের ওয়াক্ত শেষে বেলা পড়ে এসেছে। সন্ধ্যা নামবে দ্রুতই। ইমাম রহমত আলী তাড়া দিলেন মুয়াজ্জিন জসীম উদ্দিনকে ইফতার আয়োজনের জন্য। নামাজের জন্য একতলা একখানা বড় ঘর আর ওজু করবার একটি স্থান নিয়ে ছোট্ট একটি মসজিদ। মসজিদের পাশে লাগোয়া একটি ঘরে ইমাম সাহেব আর মুয়াজ্জিন সাহেব থাকেন। সামনে একটি টানা বারান্দা। মাগরিবের নামাজে স্বল্প জনসমাগম হয়। তবে তারাবির নামাজের সময় এ এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দূরের মসজিদে না গিয়ে এখানেই নামাজ পড়তে আসেন। ইমাম সাহেবের বিনয়ী আচরণ ও মার্জিত ব্যবহারের কারণেও এখানে লোকজন বেশি আসেন। তাছাড়া এলাকার লোকজনের বিপদে আপদে তাঁকে ডাকলেই পাশে পাওয়া যায়।   গ্রামের দরিদ্র ছেলে মেয়েরা রোজ ভোরে এখানে কোরআন শিখতে আসে। বারান্দায় বসে তারা সুর করে কোরআন তেলওয়াত করে। সকালটা তখন ভিন্ন আমেজ পায়। তাদের দেওয়া সামান্য অর্থ ইমাম সাহেব আর মুয়াজ্জিন সাহেবের বাড়তি আয়ের উৎস। স্বল্প বেতনের চাকরি তবু গ্রামের মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় কোনভাবে চলছিলো মসজিদটি। তবে সংষ্কার করার মতো তেমন অর্থ তহবিলে নেই।   সেদিন বিকেলে আসরের নামাজের পরে ইমাম রহমত আলী আর মুয়াজ্জিন জসীম সাহেব যখন মসজিদ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তখনই নওগাঁ রোড ধরে আসা একটি মাইক্রোবাস আচানক এসে দাঁড়ায় মসজিদের সামনে। গাড়ি থেকে নামেন ড্রাইভারসহ জনাতিনেক লোক। তাঁরা সালাম জানালে প্রতিউত্তর দিয়ে ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথায় থেকে এলেন বাবাজীরা?’   ‘ঢাকা থেকে হুজুর। আমরা যাচ্ছিলাম এ পথ ধরে। মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে এলো তাই যাত্রা বিরতি করতে হল। আমরা শুধু রাতটুকু কাটাতে চাই। ভোর সকালে রওনা দেব। যদি আপনি অনুমতি দেন তো!’   হুজুর বললেন, ‘তাহলে বাবাজীরা আপনারা সকলে আমাদের সাথে ইফতারে শরিক হোন।’   আগন্তুকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ যিনি তিনি ক'টি ৫ 'শ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘হুজুর এই টাকা রাখুন। যৎকিঞ্চিত ইফতার আর সেহেরির ব্যবস্থা করুন যা পান তাই দিয়ে । আমরা সকালে উঠেই চলে যাবো।’ ইমাম সাহেব হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিলেন এবং তা এগিয়ে দিলেন মুয়াজ্জিন সাহেবের দিকে।   বললেন, ‘জসীম তুমি বাজারে গিয়ে চিড়া, মুড়ি, কলা, জিলাপি আর চিনি আনো। আর হ্যাঁ সাথে মুরগী আর রান্নার জন্য পোলাওয়ের চাল, ডাল, তেল, লবন যা যা লাগে।’   ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজের পর তারাবির নামাজে একসাথে সব মুসুল্লিরা এক সাথে নামাজ আদায় করে বিদায় নেন। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব তাঁদের থাকার ঘরটি আগন্তুকদের ছেড়ে দিয়ে মুয়াজ্জিন সাহেবকে নিয়ে মসজিদে রাত কাটাতে গেলেন। সেহেরি সময় মেহমানরা উঠে এক সাথে সেহেরি খেলেন। সেহেরির পর তাঁরা আর এক মুহূর্তেও দেরি না করে বিদায় নিলেন। যাবার আগে একে একে বুক মেলালেন ইমাম আর মুয়াজ্জিন সাহেবের সাথে। একটু পরই সুবহে সাদিকের আভাস দেখা দেয়। ফর্সা হয়ে আসে পুবের আকাশ। আত্রাই নদীর বুকে সেই আভা পরে চিকচিক করছে নদীর পানি। নামাজ শেষ করে ইমাম সাহেব ঘরে আসেন একটু ঘুমিয়ে নেবেন বলে। সারারাত সেভাবে ঘুম হয়নি। কিন্তু একি! বিছানায় পিঠ দিয়ে চমকে উঠেন তিনি। পাতলা তোষক ধরে টান মেরে তুলে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন কিছু সময়। তাঁর তক্তপোষের নিচে অনেকগুলো বড় বড় নোটের বান্ডিল রাখা। এতো টাকা জীবনে কখনো এক সঙ্গে দেখেনি তিনি! বিষ্ময়াবিষ্ট আলেম সাহেব তিনি চিৎকার করে ডাকেন, ‘জসীম, ও জসীম এদিক এসো।’   তিনি ভাবতে থাকেন আচ্ছা সেই আগন্তক কারা! তাঁদের নামটাও জেনে রাখা হয়নি। তাঁরা ক্লান্ত ছিলেন বলে মুসুল্লিরাও কেউ আলাপ জমাতে যায়নি। তাঁরাও তো কোন পরিচয় দেননি! কোথায় থেকে এলেন, কোথায়ইবা গেলেন।   এর বেশ কিছুদিন পর দেখা যায় জীর্ণ শীর্ণ পুরোনো বিল্ডিংটার বদলে নতুন এক ঝকঝকে তকতকে মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। পাশে সুদৃশ্য এক অতিথিশালা।