লুনা রাহনুমা
এক
ওরা দুজনেই ক্লাস ফোরের ছাত্র। একজনের নাম রবার্ট, আরেকজন জন। দুজনেরই বয়স দশ বছর। একজন ডানপিটে। অন্যজন ডাকাবুকো। আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র আর পড়াশোনার প্রতি ব্যাপক অনীহাসহ আরো অনেকগুলো ব্যাপারে নিজেদের ভেতর মিল খুঁজে পাওয়ায় ক্লাসের আর সব বাচ্চাদের ভেতর এই দুজন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে একসময়। স্কুলে খেলার মাঠে জন আর রবার্ট অন্যদের মনে ঈর্ষা জাগিয়ে নিজেদের বন্ধুত্বের প্রকাশ করে আনন্দ পেত। বাচ্চাদের শার্ট টেনে ছিঁড়ে ফেলা, খারাপ কথা বলে বুলিং করা, ভয় দেখানো, শাসানো, সুবিধা মতো চড় চাপড় মেরে টিফিনের খাবার কেড়ে নেওয়া, এমন অসংখ্য কুকর্ম চালিয়ে মনের ভেতর বেশ একটা বীর-দর্প ভাব তৈরি করে ফেলেছে এই বয়সেই।
সময়টা এক ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ। শুক্রবার। স্কুলের হিসাবে সপ্তাহের শেষ দিন। দুই বন্ধু স্কুল ফাঁকি দিয়ে শপিং মলে ঘুরতে এসেছে। এটাই তাদের প্রথমবার নয়। এর আগেও অনেকবার স্কুল ফাঁকি দিয়েছে ওরা। রবার্টের চেয়ে জনের লেখাপড়ার প্রতি অনাগ্রহ বেশি। স্কুলের শিক্ষককে বলে, কঠিন লেখাগুলো আমি পড়তে পারি না। তাই স্কুলঘরে বসে থেকে সারাদিন বিরক্ত হবার চেয়ে ওরা কাছাকাছি একটা শপিংসেন্টারে চলে এসেছে একটি বিশেষ দিনে একটি বিশেষ ঘটনার আগে আগে। দুই বন্ধু বরাবরই শপিংসেন্টারে ঘুরে ঘুরে নানা দোকান থেকে ছোটোখাটো জিনিসপত্র চুরি করেই বরং বেশি আনন্দ পেয়ে থাকে। একটা ডিপার্টমেন্টাল শপের ভেতরে প্রবেশ করে ওরা। এক কোনে গিয়ে যেখানটায় সিসি ক্যামেরা নেই, স্কুল ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে ঢুকাতে থাকে চকলেট বার, চিপস, লজেন্স, ব্যাটারি, এমন যা কিছু টুকটাক বস্তু হাতের নাগালে পাওয়া যায়, সব। আর একটু পর দোকানদারকে এগিয়ে আসতে দেখেই এক দৌড়ে দোকানের বাইরে চলে গেল চোখের পলকে। কম বয়সী শক্ত চারটি পায়ের সঙ্গে বেশি বয়সী কম জোরি দুইটি পা পেরে উঠবে কেন! দোকানদারের হাত থেকে বেঁচে ফিরে খুব বিজয়ীর ভঙ্গিতে খিলখিল করে হাসতে হাসতে আরেকটি দোকানে প্রবেশ করে জন আর রবার্ট।
এবার তাদের টার্গেট ভিন্ন কিছু। এবার আর দোকানের সাজসরঁজাম নয়, বরং মানুষ চুরির চেষ্টা। মানে ছোটো মানুষ, মানে একটি শিশু চুরি করা। শপিংকমপ্লেক্সের ভেতর একটা গ্রোসারি শপে দুটি ভাইবোন শপিং করতে এসেছে ওদের মায়ের সঙ্গে। রবার্ট আর জনের টার্গেট তিন চার বছরের ছোটো ছেলেটি। কথায় কথায় ছেলেটিকে নিয়ে ওরা দোকানের বাইরে চলেও এসেছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের ভেতর ছেলেটির মা দৌড়ে আসে ছেলের খোঁজে। আর তৎক্ষণাৎ পূর্বের মতোই বাচ্চা ফেলে দে ভোঁ দৌড়। তারপর নিরাপদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু একটু জিরিয়ে নেয়। হাতে লম্বা সময়। স্কুল টাইম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা টইটই করতে পারবে। দোকান থেকে চুরি করা খাবারের কয়েকটা পেটে চালান করে দিলো। ফুরফুরে মেজাজে আবার হাঁটতে থাকে উদ্দেশ্যহীন অথচ উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপে।
এই শপিংসেন্টারের ভেতর একটা বুচার শপ আছে। কাঁচা মাছ মাংস বিক্রি হয় এখানে। বুচার শপের পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়লো জিনিসটাকে। একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে দোকানের দরজায়। বয়স দুই বছরের মতো। বেশ চমৎকার হাঁটতে শিখে গেছে। জন মিষ্টি হেসে বাচ্চাটির মনোযোগ আকর্ষণ করে। বলে, তোমার নাম কী বেবি?
-জেমস বলগার।
-তুমি চকলেট খাবে?
-হুম। মাথা নাড়ে জেমস।
স্কুলব্যাগের ভেতর থেকে দ্রুত একটা চকলেট বার বের করে দিলো জন। অন্যহাতে জেমসের একটি হাত ধরে শপিংসেন্টারে শপিং করতে আসা অন্যান্য মানুষদের ভিড়ে আলতো করে মিলিয়ে গেল তারা তিনজন। শিশু জেমস এটাকে নতুন একটা খেলা মনে করে জনের হাত ধরে আগাতে থাকে। একসময় ওরা বুচার শপের আড়ালে আর শপিংসেন্টার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে যায়। আর ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে বুচার শপে কেনাকাটা করতে থাকা বাচ্চার মায়ের কাছ থেকে। অবশ্য কয়েক মিনিট পর জেমসের মা লক্ষ করে শিশু জেমস মিসিং। শপিংকমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড পুরো মার্কেট খুঁজেও জেমসকে দেখতে পেল না। কারণ ততক্ষণে জেমস রবার্ট আর জনের হাত ধরে লিভারপুলের বড় রাস্তায় হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা লেকের কাছে চলে এসেছে। জেমসের অশক্ত শিশু পা, অতো হাঁটতে পারে না। কান্না করে ওঠে জেমস। কোলে চড়তে চায়। রবার্ট জেমসকে কোলে তুলে আছাড় দিয়ে ফেলে দেয় রাস্তার উপর। পাকা রাস্তায় মাথা ঠুকে কপালের একপাশ ফুলে ওঠে জেমসের, রক্ত পড়ে কিছুটা। কিছুক্ষণ পর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন বৃদ্ধ মহিলা এই তিনটি বাচ্চাকে একসঙ্গে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার চেষ্টা করেন।
-ওর কপালে কী হয়েছে? জেমসকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে বৃদ্ধা।
-আমরা ওকে চিনি না। ওকে আমরা পাহাড়ের কাছে খুঁজে পেয়েছি। রবার্ট বলে।
-বাচ্চাটা কি পড়ে গিয়েছিল? খুব সাংঘাতিক ব্যথা পেয়েছে। কপালের ক্ষতটি দেখিয়ে বলে বৃদ্ধা।
-আমরা যখন ওকে প্রথম খুঁজে পাই, তখনই ওর কপাল এমন ছিল। জন বলে।
-সবচেয়ে ভালো কাজ হবে তোমরা যদি ওকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাও। পুলিশ স্টেশন কোথায় তোমরা কি জানো?
-হ্যাঁ, জানি। আমরা এখন ওকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাবো। খুব দ্রুত বলে উঠে দাঁড়ায় রবার্ট।
বৃদ্ধা চলে যেতে রবার্ট আর জন জেমসকে একা রেখে দ্রুত হেঁটে চলে গেল অন্যদিকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার লেকের কাছে ফিরে আসে যেখানে ওরা শিশু জেমসকে ফেলে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। দূর থেকে দেখতে পেলো জেমস ছোট ছোট পা ফেলে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে। এবং সহসা, আবার রবার্ট আর জনের হাত ধরে আগাতে থাকে ছোট্ট জেমস। অনেকখানি পথ হাঁটার পর রাস্তার মোড়ে একটা ছোট দোকানের সামনে আরেকজন মহিলা থামায় ওদেরকে। দুজন বালকের সাথে একটি শিশুকে হাঁটতে দেখে মহিলার চোখে খানিক সন্দেহ উঁকি মারে।
-এই যে ছেলেরা, তোমরা কী করছো শিশুটিকে নিয়ে? মহিলা প্রশ্ন করে।
-আমরা ওকে রাস্তায় পেয়েছি। এখন ওকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাচ্ছি। সাবলীলভাবে উত্তর দেয় রবিন। চোখে মুখে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ ফুটে উঠতে দেখা যায় না।
-তোমরা জানো কোনদিকে পুলিশ স্টেশন?
-আমরা খুঁজে নিতে পারবো। আমাদের বাড়ি যাবার পথে পুলিশ স্টেশন পড়বে। জন বলে।
এই মহিলাটিকেও পাশ কাটিয়ে ওরা দুজন জেমসকে নিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা ধরে হাঁটতে থাকে রেললাইনের কাছাকাছি না পৌঁছানো পর্যন্ত। বুচার শপ থেকে রেললাইন পর্যন্ত অন্তত আটত্রিশ জন সন্দিগ্ধ পথচারীর সামনে পড়ে ওরা। তার ভেতর মাত্র দুজন মানুষ রবার্ট আর জনকে সন্দেহজনক মনে করে কিছু প্রশ্ন করে, একটি শিশুকে নিয়ে তারা কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে রবার্ট আর জন ঠিক পৌঁছে যায় রেললাইনের কাছে।
দুই
রবার্ট আর জনের শিশু চুরি করার ছয় দিন পরের কথা। সেদিনের তারিখ ১৮ ফেব্রুয়ারী। বৃহস্পতিবার বিকেলবেলা। জনদের বাড়ির দরজায় পুলিশের টোকা পড়ে ভীষণ জোরালোভাবে। মনে হচ্ছে দরজা খুলতে আরেকটু দেরি করলে উত্তেজিত পুলিশ লাথি মেরে বাড়ির দরজা ভেঙেই ফেলবে। পুলিশের অসভ্য আচরণে ভীষণ বিরক্ত হয়ে দরজা খোলে জনের মা। পুলিশ জানায় তারা বালক জনকে খুঁজছে। জনের মা প্রথমে পুলিশকে তার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দিতে রাজি হয় না। পুলিশের সঙ্গে কথা কাটাকাটি চরমে পৌঁছালে চারপাশের বাড়ি থেকে উঁকি দিতে থাকে কিছু উৎসুক মুখ। ততক্ষণে ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে জন। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, মা, আমি জেলে যাবো না।
বুচার শপে জেমস মিসিং হবার পর শপিং কমপ্লেক্সের সিসি ক্যামেরা থেকে জানা যায় জেমসের হাত ধরে হাঁটছিল জন। সামনে সামনে হাঁটছিল প্রাণের বন্ধু রবার্ট। স্কুলের রেকর্ড থেকে জানা যায় শুক্রবার সারাদিন তারা স্কুলে ছিল না। তাই পুলিশের সন্দেহ অনুযায়ী এবং কয়েকজন প্রতক্ষ্যদর্শীর সাক্ষ্য সাপেক্ষে গ্রেফতার করা হয় রবার্ট আর জনকে। দুজনকে নেওয়া হয় দুটি আলাদা পুলিশ স্টেশনে। দুটি আলাদা তদন্তকারী দল পরবর্তী তিনদিনে প্রায় বিশটি জেরা ইন্টারভিউ করে রবার্ট আর জনকে নিয়ে। আলাদা আলাদা বয়ান থেকে বেরিয়ে আসে দুই বালকের ভয়ংকর নিষ্ঠুর কার্যকলাপের লোমহর্ষক বিবরণ। জেরা পর্বগুলোর কয়েকটি ছিল নিম্নরূপ:
জেরা পর্ব- জন
-জন তুমি কী জানো কেন আমরা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি? গোয়েন্দা অফিসার বলে।
-আমি জানি না। আসলে, মনে হয় জানি। জন উত্তর দেয়।
-তোমার কী মনে হয়? আমরা কেন তোমার সাথে কথা বলতে চাইছি?
-আমার মনে হয় বাচ্চাটি সম্পর্কে কথা বলার জন্য!
-ঠিক।
-কেউ বাচ্চাটিকে নিয়ে গেছে আর মেরে ফেলেছে, তাই!
-ঠিক।
-ওটা আমি ছিলাম না। আমি কখনো বোটল স্ট্রান্ডে যাইনি।
-ওই প্রসঙ্গে আমরা এখনই কথা বলবো না। প্রথমে আমরা অন্যকিছু নিয়ে কথা বলবো। জন তুমি কি জানো সত্যি কথার মানে কী?
-হুম।
-তাহলে তুমি আমাদেরকে বলো সত্যি বলতে কী বোঝায়?
-সত্যি মানে হচ্ছে যে তুমি একটা কিছু করেছো, সেটাই সত্যি।
-আর তুমি যদি মিথ্যা বলো, তাহলে?
-আমি জানি না।
-মিথ্যা বলা কি ভুল?
-হ্যাঁ।
-তাহলে আমি যদি বলি যে তোমার মুখ সবুজ আর তোমার মাথার চুল গোলাপি, তাহলে কি সেটি মিথ্যা বলা হবে?
-হ্যাঁ।
-তারমানে তুমি জানো মিথ্যা কী।
জেরা পর্ব- রবার্ট
-রবার্ট তুমি টেলিভিশনে ছবি দেখেছ যে দুজন বালক শিশু জেমসকে শপিং কমপ্লেক্স থেকে নিয়ে গিয়েছে, তাই না? রবার্টকে উদ্দেশ্য করে বলে গোয়েন্দা পুলিশ।
-হ্যাঁ, ওটা আমি না। কারণ আমি ওকে নিয়ে আসিনি। নির্বিকারভাবে জবাব দেয় রবার্ট।
-ভালো কথা। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে ছেলেটির পরনের জ্যাকেটটি তোমার জ্যাকেটের মতো।
-আমার জ্যাকেটের মতো আরো অনেক জ্যাকেট আছে সবখানে।
-কিন্তু, জেমসের পাশে হাঁটতে থাকা আরেকটি ছেলের গায়ে তোমার বন্ধু জনের মতো জ্যাকেট ছিল।
-বাচ্চাটা আমার সঙ্গে হাঁটছিল না।
-কিন্তু তুমি সেখানে ছিলে, তাই না?
-হ্যাঁ। আমি সেখানে ছিলাম। আমি বাচ্চাটিকে দেখেছি। কিন্তু আমি ওকে নিয়ে আসিনি।
-বাচ্চাটি ওখানে কী করছিল?
-বাচ্চাটি ওর মায়ের সাথে ছিল। ওর গায়ে একটা নীল রঙের জ্যাকেট ছিল।
জেরা পর্ব- জন
-আমার মনে হয় জন তোমাকে জানানো প্রয়োজন যে রবার্ট এখন ওয়াল্টন লেন পুলিশ স্টেশনে আছে এবং সে শুক্রবারের ঘটনা সম্পর্কে অন্যরকম কথা বলছে। জনকে বলে গোয়েন্দা পুলিশ।
-সম্ভবত রবার্ট মিথ্যা কথা বলেছে। জন বলে।
-তোমার কাছে কী মনে হয়, রবার্ট কোন কথাটি মিথ্যা বলেছে?
-আমি জানি না। আপনারা কি মনে করেন যে বাচ্চাটিকে আমি মেরেছি?
হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করে জন। পাশে বসে থাকা জনের মা কথা বলে ছেলের সাথে। জনের মা পাশ থেকে বলে, না, উনারা এমন কিছু ভাবছেন না। তোমার আপসেট হবার কিছু নেই জন।
ওর মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গোয়েন্দা অফিসার বলে, কেউ তোমাকে খুনি বলছে না জন।
-উনারা শুধু জানতে চাইছেন শুক্রবার তুমি কোথায় ছিল। পুলিশ স্টেশনে সারাদিন বসে থাকতে না চাইলে ওদেরকে কথাটি বলে দাও জন। চিৎকার করে আদেশ করে জনের মা।
-বোটল স্ট্রান্ডে যাইনি আমি। কাঁদতে কাঁদতে বলে জন।
-আচ্ছা। এটা কি সত্যি কথা, নাকি এটা একটা মিথ্যা?
-সত্যি।
-জন আমাকে আগেই বলেছে যে রবার্ট এখন সব রকম মিথ্যা বলবে। পুলিশদেরকে উদ্দেশ্য করে বলে জনের মা।
-রবি আমাকে অনেক জায়গায় নিয়ে গিয়েছে যেগুলো জায়গা আমার পরিচিত নয়। পুলিশকে বলে জন।
ছেলের কথা থামতেই জনের মা পুলিশকে বলে যে তার ছেলে ভয় পাচ্ছে কারণ জায়গাগুলোর নাম সে জানে না। ওগুলো রবার্টের পরিচিত জায়গা। জনকে প্রশ্ন করে মা, তোমরা যেখানে গিয়েছিলে তার নাম কি বোটল স্ট্র্যান্ড?
-না।
-রবার্ট বলেছে সে তোমার সাথে ছিল। এবং তোমরা দুজনে একসাথে ছিলে বোটল স্ট্রান্ডে।
-রবার্ট বলেনি এই কথা। প্রতিবাদ করে জন।
-বলেছে।
-কিন্তু ওখানে কোনো বাচ্চা ছিল না। আমরা কোনো বাচ্চা চুরি করিনি।
-তাহলে তুমি গিয়েছিলে বোটল স্ট্রান্ডে?
জনের মা চিৎকার করে প্রশ্ন করে ছেলেকে, তুমি কি গিয়েছিলে বোটল স্ট্রান্ডে?
-হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বাচ্চা নিয়ে যাইনি আমি। আমরা কোনো বাচ্চা চুরি করিনি। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে জন।
জেরা পর্ব- রবার্ট
-আমার মনে হয় শিশু জেমসকে তুমি খুব ভালো করেই দেখেছো, কারণ তা না হলে সামান্য দেখায় ওর নীল কোটের কথা তোমার মনে থাকতো না। রবার্টকে জেরা করে গোয়েন্দা অফিসার।
-আমি বাচ্চাটিকে আনিনি।
-আমরা কি বিশ্বাস করতে পারি যে তুমি শিশু জেমস এবং তোমার বন্ধু জনের সাথে গিয়েছিলে ওখানে?
-কে বলেছে এই কথা?
-আমরা বলছি।
-না, আমি ওর সাথে ছিলাম না।
-আচ্ছা, তাহলে বলো কী ঘটেছিল সেদিন।
-আমি ওকে স্পর্শ করিনি। আমি বাচ্চাটিকে একবারও ছুঁইনি।
-সেইজন্য তুমি জেমসের জ্যাকেট খেয়াল করেছো আর জন তার হাত ধরে হাঁটছিল, ঠিক?
-ঠিক। জন বাচ্চাটির হাত ধরে কিছুক্ষণ হেঁটেছে চারপাশে, তারপর ওকে ছেড়ে দিয়েছে।
-জন বাচ্চাটিকে কোথায় ছেড়ে দিয়েছে?
-চার্চের কাছে। আমি জনকে বলেছিলাম বাচ্চাটিকে ফেলে চলে আসতে।
-আমাদের কাছে একজন মহিলার সাক্ষ্য আছে যিনি একটি শিশুকে নিয়ে দুজন বালককে লেকের দিকে যেতে দেখেছে। আমার মনে হচ্ছে ওটা তুমি আর জন ছিলে শিশু জেমসকে নিয়ে।
-না, ওটা আমি ছিলাম না।
-তাহলে তোমরা জনকে ফেলে রেখে চলে এসেছিলে?
-হ্যাঁ। আমরা স্ট্র্যান্ড থেকে জেমসকে আমাদের সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, আসলে জন নিয়েছিল। তারপর আমরা বাচ্চাটাকে রেললাইনের কাছে ফেলে চলে এসেছি।
-কেন তোমরা জেমসকে ওখানে ফেলে এসেছিলে?
-কারণ আমরা যদি ওকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতাম তাহলে আমাদেরকেও পুলিশ স্টেশনের ভেতরে যেতে হতো। পুলিশের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। জেমস তখন আর কান্নাকাটি করছিল না। শুধু চারপাশে তাকিয়ে দেখছিল। ওর কপালে শুধু একটুখানি ছিলে গিয়েছিল।
-তোমার ছোটভাই বেন যদি দুই বছরের হতো, তাহলে কি তুমি তাকে ওখানে ফেলে আসতে?
-না ফেলে আসতাম না। কিন্তু জেমস আমার ভাই না।
-কিংবা ওই বয়সী অন্য কোনো শিশুকে রেল লাইনের কাছে ফেলে আসতে ওভাবে, একা?
-সে আমার কেউ হয় না। তার সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। মা, জনকে কি এইসব কথা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে? রবার্ট বিরক্ত মুখে প্রশ্ন করে তার মাকে।
জেরা পর্ব- জন
-রবার্ট বলছে যে তুমি শিশু জেমসের হাত ধরে ওকে স্ট্র্যান্ড শপিং সেন্টার থেকে নিয়ে এসেছ? জনকে বলে গোয়েন্দা পুলিশ।
-না। আমরা আনিনি। জন বলে।
-আমরা নয়। রবার্ট বলছে তুমি এনেছো।
-আমরা আনিনি।
-রবার্ট আনেনি। তুমি এনেছো।
-আমি আনিনি।
-তাহলে রবার্ট কেন বলছে এই কথা?
-ও একটা মিথ্যুক। আমি জেমসকে হাত ধরে নিয়ে আসিনি। আমি ওকে স্পর্শ করিনি।
জেরার মুখে এবার ভীষণভাবে কাঁদতে শুরু করে জন। গোয়েন্দা অফিসার জনকে বলে সে চাইলে যেকোনো সময় বিরতি নিতে থামতে পারে। জন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, তারা শিশু জেমসকে শপিং সেন্টার থেকে তুলে নিয়ে লেকের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর আর কিছু জানে না সে।
-আপনারা কি আমাকে জেলে ঢুকাবেন? কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করে জন।
জেরা পর্ব- রবার্ট
-দেখ রবার্ট, জেমস যদি রক্তাক্ত হয়ে থাকে আর জেমসের রক্ত যদি তোমার ও জনের কাপড়ে পাওয়া যায়, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে জেমসের শরীর থেকে যখন রক্ত পড়ছিল তখন তোমরা ওখানে উপস্থিত ছিলে। রবার্টকে বলে গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার।
-কিন্তু আপনারা কীভাবে বুঝবেন যে ওটা শিশু জেমসের রক্ত? চটপটে পাল্টা প্রশ্ন করে রবার্ট। চ্যালেঞ্জ করতে চায় পুলিশের জেরাকে।
-আমরা জানি, কারণ আমরা তার শরীরটা খুঁজে পেয়েছি।
-কোথায়?
-কোথায় পাওয়া গিয়েছে তাতে কিছু যায় আসে না। হয়তো তাকে প্রথমে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
-কেন?
-ওর হাত থেকে রক্ত নেওয়ার জন্য যেমন তোমার হাত থেকে নিয়েছে। রবার্টের মা বলে পাশ থেকে।
-ডাক্তার কি ওকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে? রবার্ট প্রশ্ন করে।
-না, তা পারবে না। গোয়েন্দা অফিসার বলে।
-আমাকে বলা হয়েছে জেমসের শরীর দুই টুকরো হয়ে গিয়েছে। যদি তার শরীর কেটে দুই টুকরো হয়ে যায় তারমানে সে আর বেঁচে উঠতে পারবে না, তাই না! আমার কাপড়ে পাওয়া রক্ত আমার নিজের হতে পারে যদি আমার শরীরে কোথাও কেটে থাকে। ঘাড়ের ডান দিকে চুলকাতে চুলকাতে বলে রবার্ট।
-কিন্তু তোমার কাপড়ে জেমসের রক্ত পাওয়া গিয়েছে, এবং সেই রক্ত তোমার জুতাতেও পাওয়া গিয়েছে।
এবার কাঁদতে আরম্ভ করে রবার্ট। ঘটনার শুরু থেকে জেরার এই পর্যন্ত সে ভীষণ শান্ত এবং নির্লিপ্ত ছিল। নিজের কাজের ব্যাপারে এতটুকু অনুশোচনাবোধ করেনি কিংবা অপরাধ অনুভব করেনি এতক্ষণ পর্যন্ত। কিন্তু এখন সে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়ে।
-আমি জেমসকে হত্যা করিনি। আপনারা বলতে চাইছেন আমি ওকে মেরেছি। জনকে বলছেন না কেন এসব কথা? জনকে জিজ্ঞেস করুন এসব। আমি শিশু জেমসকে স্পর্শ করিনি।
জেরা পর্ব- জন
বাবা ও মায়ের মাঝখানে বসে আছে জন। মা তাকে খুব করে আস্বস্ত করছে সত্যি কথাটি পুলিশকে জানাতে। ছেলের মুখে আর গালে হাত বুলিয়ে বলছে, সত্যি যাই হোক না কেন বাবা মা তাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে। জন এক পর্যায়ে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কোলে মুখে রেখে কথাটি স্বীকার করে। বলে, “আমি তোমাকে বলতে চেয়েছি মা, আমি ওকে মেরেছি।“ তারপর পুলিশের দিকে তাকিয়ে কান্না ভরা চোখে বলে, “জেমসের মায়ের কী হবে? আপনি কি তাকে বলবেন যে আমি সরি।“
-জেমসকে তোমরা কোথায় পেয়েছিলে? পুলিশ জিজ্ঞেস করে জনকে।
-বুচার শপে। আমি শুধু জেমসকে আমাদের সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর ওকে মেরে ফেলার চিন্তা আসে রবার্টের কাছ থেকে।
-তুমি কেন জেমসকে নিয়ে যেতে চাইলে?
-আমি রবার্টকে বলছিলাম বাচ্চাটি কি হারিয়ে গিয়েছে নাকি অন্যকিছু। ওর মাকে খুঁজেছি চারপাশে। কোথায় না পেয়ে শেষে আমরা বিরক্ত হয়ে যাই আর শপিং সেন্টারের বাইরে লেকের কাছে চলে যাই। লেকের কাছে যাবার পর বাচ্চাটি খুব কাঁদছিল। আমরা ওকে কোলে তুলে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেই, সেজন্য ওর কপালে কেটে যায়।
-জেমস কি তখন কাঁদছিল?
জন মাথা নাড়ে। বলে, আমরা বাচ্চাটিকে ওখানে ফেলে রেখে দৌড়ে চলে গিয়েছিলাম অন্যদিকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসি। দেখি ততক্ষণে জেমসও আমাদের দিকেই আসছে। আমরা ওকে নিয়ে রেল স্টেশনের কাছে যাই। রবার্ট একটা রঙের পট খুলে জেমসের মুখে রং ছুড়ে মারে। এরপর আর কিছু বলতে পারবো না আমি।
-কেন?
-কারণ সেটা সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ।
-ঠিক আছে। আমি জানি পরের অংশটুকু খুব ভয়ংকর। কিন্তু তুমি আমাদেরকে বলতে পারবে। এখন একটু রেস্ট নাও। ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবো। তারপর আমাদেরকে বলো এরপর কী ঘটেছিল।
-আমরা ওকে রেল লাইনের উপরে নিয়ে গিয়েছি। আমরা ওর গায়ে অনেকগুলো পাথর ছুড়ে মেরেছি।
-কে পাথর ছুড়েছে?
-রবি। ও বাচ্চাটিকে বলেছে `ওখানে দাঁড়িয়ে থাকো, আমরা তোমার ব্যবস্থা করছি।` তারপর রবার্ট পাথর তুলে নেয় এবং জেমসের মুখে পাথর ছুড়ে ছুড়তে থাকে।
-তারপর?
-তারপর রবি আমাকে বলে, রেল লাইন থেকে পাথর তুলে নাও আর ওকে মারো। কিন্তু আমি শুধু কয়েকটি পাথর রাস্তায় ছুঁড়েছি। ইচ্ছে করে জেমসের গায়ে লাগাইনি, কারণ আমি ওকে পাথর মারতে চাইনি। রবি আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়া পাথরগুলো তুলে নিয়ে জেমসকে মারতে থাকে। রবি প্রায় দশটা পাথর মেরেছে। আমি মেরেছি ছয়টা অথবা পাঁচটা। আমার মারা পাথরগুলো জেমসের হাতের পাশে লেগেছে শুধু, কারণ আমি কেবল ওর পাশ দিয়ে মারতে চেয়েছি পাথরগুলোকে।
-তখন কি জেমসের শরীর থেকে রক্ত পড়ছিল?
-অনেক। ওর সমস্ত শরীর থেকে রক্ত পড়ছিল।
জেরা পর্ব- রবার্ট
-তুমি অনেক কথা অস্বীকার করেছো রবার্ট। সেসব ব্যাপারে আমাদের অনুমান সঠিক ছিল এবং এই ব্যাপারেও আমাদের অনুমান সঠিক। গোয়েন্দা অফিসার জোরালো গলায় বলে রবার্টকে।
-আমি জেমসকে মারিনি। নির্লিপ্ত গলায় বলে রবার্ট।
-তুমি তাদেরকে সত্যি কথাটি বলে দাও রবার্ট, তাহলে কয়েক মিনিটের ভেতর এই অসহ্যকর আলোচনাটি সমাপ্ত হয়ে যাবে, রবার্টের মা হুংকার দেয় ছেলের দিকে তাকিয়ে।
-জন ওর মুখে একটা পাথর ছুড়ে মেরেছে। রবার্ট বলে।
-কেন? আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে মা।
-আমি জানি না। সরল জবাব আসে রবার্টের মুখ থেকে।
-এইবার আমরা আসল সত্যিটুকু জানবো তাই না? গোয়েন্দা পুলিশ বলে।
-আসল ঘটনা যাই হোক না কেন, সব দোষ আমার ঘাড়ে এসে পড়বে কারণ আমার কাপড়ে রক্ত পাওয়া গিয়েছে। মুখ বাঁকা করে বলে রবার্ট।
-জন বাচ্চাটির দিকে পাথর ছুড়ে মারার পর কী হলো?
-পাথরটি জেমসের মুখে গিয়ে লাগে এবং সে মাটিতে পড়ে যায়।
-কেন তোমরা বাচ্চাটিকে রেখে চলে আসলে না? রবার্টের মা ক্ষিপ্ত হয়ে প্রশ্ন করে ছেলেকে।
-আমি চলে এসেছি। এরপর আমি জনকে ওখানে একা রেখে দৌড়ে চলে এসেছি।
-বাচ্চাটা তখন কী করছিল? মা জিজ্ঞেস করে।
-সে মাটিতে পড়েছিল, কাঁদছিল।
-ও কি জেগেছিল নাকি ঘুমাচ্ছিল?
-কী বলতে চাইছ?
-বাচ্চাটি কি তখন মাটিতে পড়ে ঘুমাচ্ছিল?
-না, বাচ্চাটা তখন জেগে ছিল।
একের পর এক জেরা পর্ব শেষ করে রবার্ট আর জন অবশেষে প্রকৃত ঘটনাটি পুলিশের কাছে প্রকাশ করে। তারা দুই বন্ধু রেল লাইনের উপর শিশু জেমসকে দাঁড় করিয়ে রেখে ওর শরীর লক্ষ করে অনেকগুলো পাথর ছুড়ে মারে। জেমসকে ওরা শপিং সেন্টার থেকে অপহরণ করেছে, অসংখ্যবার লাথি মেরেছে, আছাড় মেরেছে। রবার্ট টেনে খুলেছে শিশু জেমসের প্যান্ট আর আন্ডার প্যান্ট। জেমসের পায়ের জুতা জোড়া খুলেছে জন। রেল লাইনের পাশে পড়ে থাকা একটা বাইশ পাউন্ড ওজনের লোহার বার তুলে জেমসের মাথায় আঘাত করেছে রবার্ট। দুই বন্ধুর নির্মম কার্জকলাপ শেষ হবার পর শিশু জেমসের নিথর শরীরটাকে তারা ফেলে রাখে রেল লাইনের উপর। কিছুক্ষণ পর লাইন দিয়ে আসতে থাকে একটা দ্রুতগামী ট্রেন। ট্রেন চালক দূর থেকে লাইনের উপর পড়ে থাকা বস্তুটাকে কোনো শিশুর ফেলে যাওয়া পুতুল মনে করে। চলন্ত ট্রেনের চাকার তলায় পড়ে দুই খন্ড হয়ে যায় শিশু জেমসের মৃত শরীরটি।
এই ঘটনার একদিন পর, ১৪ই ফেব্রুয়ারী, রেল লাইনের পাশে খেলতে যাওয়া কয়েকজন বাচ্চার চোখে পড়ে জেমসের মৃত দেহ। দূর থেকে দেখে প্রথমে তারা ভেবেছিল বোধহয় লাইনের উপর একটা পুতুল পড়ে আছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারে ওটা একটা মানুষের কাটা শরীর। মৃত জেমসের শরীরে মোট ৪২টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। মাথার খুলিতে ১টি বড় ফাটল, সম্ভবত লোহার বারের আঘাতের কারণে হবে সেটি। তবে ঠিক কোন আঘাতে জেমসের মৃত্যু হয়েছিল সেকথা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। জেমসের মুখের ভেতর পাওয়া যায় তিনটি ব্যাটারি এবং পায়ুপথে কয়েকটি ব্যাটারি। ধারণা করে হয় মৃত্যুর পূর্বে শিশু জেমস এই দুই বালকের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।
তিন
জনবসতি কম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা প্রায় সবাই সবার পরিচিত। নির্জন সবুজের দেশে নতুন কেউ বেড়াতে আসলে কিংবা কিছুদিনের জন্য থাকতে এলে, পুরোনো বাসিন্দাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না কখনো। তাই মার্টিন নামের আঠারো উনিশ বছরের ছেলেটি যখন সবুজের কোল ঘেঁষা শান্ত গ্রামে পরপর কয়েকদিন থেকে গেল, তখন আশেপাশের অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছি, ছেলেটি শহর ছেড়ে এখানে বসে কী করছে? কেউ কেউ আসে মার্টিনের সাথে পরিচিত হতে। আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেওয়া পাহাড়ি মানুষদের স্বভাব না হলেও মার্টিনকে অনেকেই আগ্রহ ও কৌতূহলের চোখে দেখে। প্রথমত, মার্টিন নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে একথা সুস্পষ্ট। দ্বিতীয়ত মার্টিন দেখতে আধুনিক, স্কুল কলেজে লেখাপড়া করা যুবকদের মতো তার স্মার্ট চলাফেরা পাহাড়িদেরকে আকর্ষণ করেছে।
মার্টিনকে একদিন ঝর্ণার পাশে একটা ছোট্ট চার বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে আলাপ করতে দেখা যায়। ছেলেটি পাহাড়ি সর্দারের নাতি। মার্টিন বুঝতে পারেনি দূর ঝোপ থেকে তাদের উপর নজর রেখে চলছিল কয়েক জোড়া চোখ। মার্টিন যখন ঝর্ণার পাশে বালকটিকে প্রায় উলঙ্গ করে ফেলেছে, ঠিক তক্ষুণি কয়েকজন পাহাড়ি জনতা হৈ হৈ করে এসে মার্টিনকে ঘিরে ফেলে। জ্যাকেট দিয়ে হাত বেঁধে সর্দারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। শহর থেকে থানার দারোগা আসে। জিপে করে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ স্টেশনে। জেল থেকে বের হবার পর দ্বিতীয়বার আবার জেলে যায় মার্টিন ওরফে জন।
১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে শিশু জেমসকে অপহরণ এবং হত্যা করার অভিযোগে জন এবং রবার্ট দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে কোর্ট। যদিও হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের উভয়ের বয়স ছিল দশ বছর অর্থাৎ `নাবালক`, তবুও গোয়েন্দা অফিসারদের জেরা এবং তথ্য প্রমাণ অনুসারে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালদের মতামত ছিল যে এই দুজন বালকই সম্পূর্ণভাবে অবহিত ছিল `ঠিক` এবং `বেঠিক` কাজের পার্থক্য সম্পর্কে। তাই কোর্টের বক্তব্য ছিল যে এমন জঘন্য একটা অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করার মতো পর্যাপ্ত মানসিক পরিপক্কতা ছিল এই দুই বালকের। তাই কোর্ট তাদেরকে `প্রাপ্তবয়স্ক` অপরাধী হিসেবে শাস্তি ঘোষণা করে। ১৯৯৩ সালের ২৪ নভেম্বর, দুজনের বয়স যখন ১১ বছর, ট্রায়াল জজ তাদেরকে ৮ বছরের জেল শাস্তি ঘোষণা করেন। কিন্তু চিফ লর্ড জাস্টিস এই শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ বছর করেন। পুনরায় হোম সেক্রেটারি জেলের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ বছর করেন। কিন্তু দুই অপরাধীর আইনজীবীর দায়ের করা একটি আইনগত চ্যালেঞ্জ সফল হওয়ায় জন আর মার্টিনের জেল জীবন শুরুর সেই ৮ বছরেই নির্ধারিত থাকে।
২০০১ সালের জুন মাসে এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয় যে শিশু জেমসের হত্যাকান্ডটি সমাজ এবং জনগণের জন্য কোনো রকম হুমকি তৈরি করার সম্ভাবনা নেই, তাই নির্ধারিত ৮ বছরের কারাবাস শেষ হবার পর রবার্ট ও জনকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাদের দুজনেরই পুরোনো আইডেন্টিটি মুছে ফেলে নতুন আইডেন্টিটি প্রদান করা হয়। সরকারের মনে ভয় ছিল, এই দুই বালক খুনিকে যদি সমাজে আগের পরিচয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের উপর চড়াও হতে পারে, দুই খুনি বালকের জীবন সংশয় দেখা যেতে পারে। যদিও নতুন আইডেন্টিটি নিয়ে মুক্ত জীবন শুরু করলেও সমাজে অনেকেই ওদের দুজনকে সনাক্ত করতে পেরেছিল।
জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জন নানা ধরণের অপরাধমূলক কাজ করে যেতে থাকে, অবৈধ নেশা দ্রব্য ব্যবহার করা, মদ্য পান করা, অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের অশালীন ছবি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করার মতো আরো অনেক অপরাধ। তাই ২০০১ সালে জেল থেকে মুক্তি পাবার পর ২০১০ সালে জন আবার জেলে যায় তার জেল মুক্তি লাইসেন্সের শর্তাবলী লঙ্ঘনের কারণে, তখন তাকে পুনরায় ৪০ মাসের জেল শাস্তি ঘোষণা করা হয়। ২০১৩ সালে আবার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় জনকে এবং ২০১৭ সালের নভেম্বরে ব্যক্তিগত কম্পিউটারে শিশু যৌন নির্যাতনের ছবি রাখার কারণে আবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই শাস্তির পর থেকে জন কি এখনো জেলেই আছে নাকি কোথায় আছে, সে কথা কেউ বলতে পারে না। অন্যদিকে ২০১০ সালে জেল থেকে মুক্তি পাবার পর রবার্ট আর কখনো জেলে যায়নি। ৮ বছরের জেল জীবনে রবার্ট এবং জন দুজনেই জেল কর্তৃপক্ষকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে তাদের নরম, বিনীত ও মার্জিত আচার আচরণ দেখিয়ে। মুক্তির আগে মেন্টাল হেলথ টিম তাদেরকে পরীক্ষা করে বলেছিল, এই দুই যুবকের কারোর ভেতরেই অপরাধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না, এবং দ্বিতীয়বার এদের কারোর জেলে ফেরত আসার কোনোই কারণ নেই। জন কারা কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, সে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থির এবং সমাজে ফিরে যাবার পর যদি কেউ তাকে আগের পরিচয়ে চিহ্নিত করতে পারে, তাহলে তার প্রাণ নাশের শংকা আছে। পরবর্তীতে যদিও দেখা গিয়েছে মেন্টাল হেলথ টিমের পর্যবেক্ষণ কতটা ভুল ছিল। কতটা ভুল ছিল রবার্ট আর জন নামের দুই বালক খুনিকে সমাজে মুক্তভাবে ফিরে আসতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে এই দুই বালক সর্বকনিষ্ঠ দোষী সাব্যস্ত খুনি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মৃত শিশু জেমসের মা এখনো ছেলের হত্যার ব্যাপারে কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় আছেন। যেমন, সেদিন শিশু জেমসের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? সত্যি কোন আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল তার সন্তানের? মৃত্যুর আগে জেমস কী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল দুই খুনি বালকের হাতে?
পাদটীকা: যুক্তরাজ্যের লিভারপুলে হত্যা করা জেমস প্যাট্রিক বুলগের এই অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার শাস্তিটি সঠিক হয়নি বলে মনে করে বেশিরভাগ ব্রিটিশ নাগরিক। পুলিশ স্টেশনে রবার্ট থমসন ও জন ভেনাবলেস এর জেরা পর্বের প্রশ্ন ও উত্তরগুলোর অধিকাংশই অরিজিনাল জেরা থেকে অনুবাদ করা।